ঐতিহাসিক গাদীর-ই-খুম দিবস উপলক্ষে খুলনায় আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতনীর উদ্যোগে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা সভায় বক্তারা গাদীর-ই-খুমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং পবিত্র আহলে বাইতের আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে খুলনা সম্মিলিত ওলামায়ে কেরাম ও জামিয়্যাতে মুহিব্বিনে আহলে বাইতের সভাপতি মাওলানা ইব্রাহীম ফায়জুল্লাহ বলেন, ঈদে গাদীর মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। বিদায় হজের সময় গাদীর-ই-খুমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত আলী (আ.)-কে উম্মতের পথপ্রদর্শক ও ‘মাওলা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আহলে বাইতের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
বায়তুন নূর জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মান্জুরুল আহমাদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, মহানবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-এর মর্যাদা ও নেতৃত্বের বিষয়ে বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ও অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
দক্ষিণাঞ্চলের সুপরিচিত বক্তা মাওলানা নূরুল ইসলাম ফিরোজী বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি এবং মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন সংকটের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ পরিহার করে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মুসলিম বিশ্বের কল্যাণ ও অগ্রগতির জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতি প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহিম খলিল রাজাভী গাদীর-ই-খুমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, বিদায় হজের পর গাদীর-ই-খুমে মহানবী (সা.) হযরত আলী (আ.)-এর নেতৃত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রদান করেন। ঈদে গাদীর ইসলামের পরিপূর্ণতা ও আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। তিনি বলেন, “আমাদের অবশ্যই পবিত্র আহলে বাইতের মহান আদর্শকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক ঘোষিত ‘মাওলা’ শব্দের প্রকৃত গভীরতা ও অর্থ অনুধাবনের জন্য সংশ্লিষ্ট হাদিসসমূহকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিদায় হজের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রিয় নবী (সা.) উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—’আমি কি তোমাদের জান বা নাফসের চেয়েও তোমাদের অধিক নিকটবর্তী ও অভিভাবক নই?’ উপস্থিত সকলে সমস্বরে উত্তর দিয়েছিলেন—’অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমাদের অভিভাবক।’ ঠিক তখনই আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করলেন—’অতএব, আমি যার মাওলা (অভিভাবক), এই আলীও তার মাওলা। আমি যার অভিভাবক, আলীও তার অভিভাবক।’ আর এই ঈদে গাদীর হচ্ছে মূলত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করার ঐতিহাসিক ও মহাসম্মানিত দিন।”
অন্যতম আলোচক হুজ্জাতুল ইসলাম ড. এম. এ. কাইউম বলেন, গাদীর-ই-খুমের ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি এ বিষয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “গাদীর-ই-খুমের ময়দানে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ সমাপ্ত করার পর, হযরত উমর স্বয়ং এগিয়ে এসে ইমাম আলী (আ.)-কে মোবারকবাদ ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন—’হে আলী! আপনাকে অভিনন্দন। আজ থেকে আপনি আমার এবং সমস্ত মুমিন নর-নারীর অভিভাবক (মাওলা) হলেন।’ ইসলামের এই সুষ্পষ্ট ইতিহাস ও সত্যগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের সকলেরই উচিত যেকোনো মন্তব্য করার আগে গভীর গবেষণা করা। বিশেষ করে আজকের সমাজের কাছে আমার আকুল আহ্বান—আপনারা সত্যকে জানুন এবং এই সকল ঐতিহাসিক বিষয়ে আরও বেশি বেশি পড়াশোনা ও অধ্যয়ন করুন।”
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, আলেম-ওলামা এবং আহলে বাইতপ্রেমী মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করেন। শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, ইমামে জামানার (আ.) স্মরণ, মহান আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শানে হামদ, নাত ও কাসিদা পরিবেশন করা হয়। সভা শেষে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, ঐক্য ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।



























