শতাধিক মার্কিন সেনা হতাহত ও বিপুল খরচ, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা, এফ-১৫ ধ্বংস : কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকা- : বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস : হরমুজে দুই তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ : সউদী আরবের ওপর হুথিদের অবরোধে চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র
চলমান ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে শত শত কোটি ডলারের অতিরিক্ত বরাদ্দের আবেদন নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের তীব্র প্রশ্নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুক্তরাষ্ট্রের সেনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে গতকাল রাতে তিনি উপস্থিত হন।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাত সামাল দিতে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন পেন্টাগন কর্মকর্তারা। যুদ্ধের কারণে মার্কিন বাহিনীর সামরিক গোলাবারুদ ও তহবিল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনপ্রণেতারা। তবে সেনাবাহিনীর প্রকৃত সক্ষমতা ও প্রয়োজন সম্পর্কে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক রিপাবলিকান সদস্য।অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের এই শুনানিতে সেনেটরদের কাছ থেকে সেনাদের আহতের তথ্য দেরিতে প্রকাশের বিষয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েন। সম্প্রতি জানা গেছে, যুদ্ধে আহত মার্কিন সেনাদের তথ্য দ্রুত প্রকাশে গড়িমসি করছে পেন্টাগন। সেন্ট্রাল কমান্ড সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অঘাতক হামলার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করেনি, যার কারণে সামরিক ওয়েবসাইটে তথ্যের হালনাগাদ বেশ বিলম্বিত হয়েছে। এ বিষয়ে পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল জানান, গত ৭ জুলাইয়ের পর থেকে অন্তত তিনজন মার্কিন সেনা নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছেন। গত মার্চ মাসের পর ইরানি হামলায় মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর ঘটনা এটিই প্রথম। সেনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির এই শুনানিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের সাথে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, এফ-১৫ ধ্বংস : জর্ডানের ভূখ-ে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সেখানে থাকা সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। হামলায় একটি মার্কিন সামরিক রাডার ব্যবস্থা এবং একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরানের এই অভিজাত বাহিনী। আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। একই হামলায় একটি সুরক্ষিত শেল্টারে থাকা এফ-১৫ যুদ্ধবিমানও ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকা- : আমেরিকার টানা দশম রাতের বোমাবর্ষণের পর মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানি হামলায় কুয়েতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশুদ্ধকরণ (ডি-স্যালাইনেশন) প্ল্যান্ট এবং কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় অবকাঠামোগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস :
বাহরাইনের মুহাররাক এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডার স্টেশন ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে আল-রিফফা এলাকায় পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি পেট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে বাহিনীটি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে এসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযানে নির্ধারিত সামরিক স্থাপনাগুলো সফলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
হরমুজে দুই তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ :
গতকাল হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি। আইআরআইবি প্রকাশিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির ‘দক্ষিণঘেঁষা অনিরাপদ অংশ’ দিয়ে চলাচলের সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। বাহিনীটির দাবি, উদ্ধারকারী দল উভয় জাহাজের ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে। ঘটনার পর হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্ক করে আইআরজিসি বলেছে, মার্কিন বাহিনীর তথ্যে নির্ভর না করে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ এড়িয়ে চলতে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হবে।
সউদী আরবের ওপর হুথিদের অবরোধে চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র :
সউদী আরবের ওপর সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার মধ্যে হুথিদের এই আকস্মিক পদক্ষেপে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরাসরি চাপের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউটের অনলাইন জার্নাল ‘রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লোহিত সাগরে সউদী আরবের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘ইয়ানবু’ বন্দর ও বাব-আল-মানদেব প্রণালীকে লক্ষ্য করে হুথিরা তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। সউদী আরব এই বন্দর দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪৬ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে। হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা যদি ইয়ানবু বন্দর বা বাব-আল-মানদেব প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবরোধ কার্যকর হলে এশিয়ামুখী তেলবাহী জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল বা আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে। এতে ট্রানজিট সময় দুই থেকে তিন সপ্তাহ বেড়ে যাবে, যা পরিবহন খরচ ও ইন্স্যুরেন্স ফি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সংকট ট্রাম্প প্রশাসনকে দ্বৈত চাপে ফেলবে। একদিকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের ভয়, অন্যদিকে সউদীকে নিজেদের বিমানঘাঁটি মার্কিন হামলার কাজে ব্যবহারে বাধা দেওয়ার ওপর রিয়াদের চাপ। পূর্ব অভিজ্ঞতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের শুরুতে হুথিদের দমনে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিমান হামলা চালালেও তাদের চূড়ান্তভাবে দমন করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসন হুথিদের সাথে চুক্তি করে মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর বাণিজ্য সুরক্ষার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সামুদ্রিক রুট মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও জটিল কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পথেই হাঁটতে হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।Legal
ইরানের সাফল্য প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে :
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংক্রান্ত আলোচনায় তেহরানের সাফল্য প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। জাতীয় শিল্প ও খনি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এই আলোচনাগুলোতে আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়েছি। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেল রপ্তানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ সুরক্ষায় হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অপর পক্ষ চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে।’ তিনি আরও যুক্ত করেন, ‘এই প্রক্রিয়ায় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের অর্জন প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ছিল। আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন জটিল বিষয় দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা ও পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছি।’
সূত্র : আল-জাজিরা, গালফ নিউজ, সিএনএন।


























