আরবের উম্মী সমাজে ইসলামের অভ্যুদয় এ ধর্মের অগ্রগতি ও বিস্তারের অন্যতম নেপথ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত। কেননা একটি মতাদর্শ সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বকীয়তা ও পরিভাষায় এবং ভিন্ন কোন মতাদর্শ ও সংস্কৃতির সাথে সংমিশ্রণ ব্যতিরেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে- উক্ত মতাদর্শকে এমনই স্থানে অভ্যুদয় হওয়া প্রয়োজন যেখানে পূর্বে কোন বিশেষ সাংস্কৃতিক চিন্তা ও দর্শনের অস্তিত্ব ছিল না; যেমন: আরব সমাজ। যখন আরব ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয় ঘটে তখন সবার নিকটই বিষয়টি স্পষ্ট ছিল যে, এ ধর্ম সম্পূর্ণ নিজস্ব স্বকীয়তায় উদ্ভাসিত হবে; অর্থাৎ এ ধর্মের স্বার্থে স্থানীয় ও অস্থানীয় কোন মতাদর্শ ও সংস্কৃতির পরিভাষার সংমিশ্রণ ঘটবে না যেমন হাবাশি, ইরানি অথবা অন্য কোন জাতি ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও মতাদর্শের। বরং এ ধর্ম নিজস্ব পরিভাষা ও সংস্কৃতিতে বিস্তার লাভ করে। হয়তো এ ধর্মের বাণীসমূহ উক্ত অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে; অবশ্য এমনটিই ছিল। তারা যখন কুরআনের বাণীসমূহ শ্রবণ করত, বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ত। ভাষা আরবী কিন্তু বিষয় ও পরিভাষাসমূহ তাদের নিকট সম্পূর্ণ নতুন ও অপরিচিত। এজন্য তারা হতচকিত ও বিস্মৃত হত; কিন্তু বিশেষ আগ্রহের সাথে অনুধাবন করত ও দীক্ষা গ্রহণ করত। ফলে যারা ঈমান আনয়ন করত, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথেই ঈমানপোষণ করত; কোন ধরনের বাধা-বিপত্তি তাদেরকে বিরত রাখতে পারত না।
সুতরাং এ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, তৎকালীন আরবের উম্মী সমাজে ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয় এবং উক্ত পরিবেশে ইসলামের বিধি-বিধানের প্রচার ও প্রসার সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে পরিগণিত। কারণ সে পরিবেশ ইসলামের মতাদর্শ অক্ষুন্ন রাখতে এবং অন্য কোন সংস্কৃতি ও মতাদর্শের সাথে মিশ্রিত না হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল। ফলে ইসলাম অন্য কোন ধর্ম ও মতাদর্শ কর্তৃক প্রভাবিত হয় নি। কাজেই এ বিষয়টি রাসূলের (সা.) বে’সাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য; যা ইসলাম ধর্মের বিকাশে বিশেষ অবদান রেখেছিল।
স্বজাতির মধ্য থেকে রাসূলকে (সা.) বে’সাতের
দায়িত্বে অধিষ্ঠিতকরণ
নিশ্চয়ই আরব ভূখণ্ডের লোকদের মধ্য থেকেই রাসূলুল্লাহকে (সা.) বে’সাতের গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিতকরণ আল্লাহর পক্ষ থেকে অপর এক নেয়ামত হিসেবে গণ্য। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ
“উম্মীদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন।” রাসূল (সা.) ‘তাদেরই মধ্য থেকে’- এখানে ‘তাদেরই মধ্য থেকে’ বলতে কি বুঝান হয়েছে? এ সম্পর্কে পূর্বেকার আলোচনাতে আমরা কয়েকটি সম্ভাব্য অর্থ এবং সেগুলোর প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছি। কিন্তু এ অধ্যায়ে এ প্রসঙ্গে তুলনামূলক বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করব।
رَسُولًا مِّنْهُمْ “তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে” অর্থাৎ নিরক্ষরদের মধ্য থেকে কিংবা অশিক্ষিতদের মধ্য থেকে। বিষয়টি স্পষ্ট করতে কুরআনের দু’টি আয়াতের কিয়দাংশ এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন; তা হচ্ছে-
مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ
“তুমি তো অবগত ছিলে না, কিতাব কী জিনিস এবং বিশ্বাস কী?” অপর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে,
وَمَا كُنتَ تَتْلُو مِن قَبْلِهِ مِن كِتَابٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ
“তুমি এর পূর্বে না কোন কিতাব আবৃত্তি করতে, আর না ডান হাতে কিছু লিপিবদ্ধ করতে।” এ আয়াতটি বাহ্যিকভাবে এ বিষয়ের প্রতি ইশারা করে যে, রাসূল (সা.) কখনও কোন কিতাব পাঠ করেন নি এবং কোন কিছুও লিপিবদ্ধ করেন নি। এক্ষেত্রে দু’টি ভিন্ন মতের প্রচলন রয়েছে; প্রথমটি হচ্ছে- তিনি লিখতে ও পড়তে অক্ষম ছিলেন। আর দ্বিতীয় মত হচ্ছে- তিনি লিখতে ও পড়তে জানতেন। কিন্তু অন্য কারও নিকট থেকে তিনি লেখা-পড়ার শিক্ষা গ্রহণ করেন নি। বরং খোদায়ী কুদরতে তিনি এ সক্ষমতা অর্জন করেন। যদিও রাসূলের (সা.) জীবদ্দশাতেও এমন কোন ঘটনার অবতারনা হয় নি যে, তিনি কোন কিছু পাঠ করবেন কিংবা কোন কিছু লিপিবদ্ধ করবেন। অবশ্য এখানে এ বিষয়টি প্রমাণ করা আমাদের লক্ষ্য নয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) লিখতে ও পড়তে পারতেন কি পারতেন না। কারণ এটি আমাদের এ আলোচনার মূখ্য বিষয় নয়। কিন্তু এ বিষয়টি সর্বজনবিদিত সত্য যে, মহানবি (সা.) ঐ সব মানুষের মধ্য থেকে উত্থিত হন; যারা শিক্ষিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সমগ্র মক্কা অঞ্চলে মাত্র ক’জন শিক্ষিত ব্যক্তি ছিল, কিন্তু তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন না। বরং তিনি অন্যদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; এ কারণে হয়তো বলা হয় তিনি লিখতে ও পড়তে পারতেন না।
অবশ্য রাসূল (সা.) কর্তৃক প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা গ্রহণ না করা এবং অন্য কারও নিকট থেকে লেখাপড়ার দীক্ষা না নেওয়ার নেপথ্যে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বিদ্যমান। কেননা পূর্বোক্ত আয়াতের শেষাংশে রাসূলের (সা.) লিখতে ও পড়তে না জানার কারণ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে,
إِذًا لَّارْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
“কেননা যদি এমন হত তবে মিথ্যাপন্থীরা সংশয়ে পতিত হত।” অর্থাৎ বাতিলপন্থীরা সন্দেহপ্রবণ হয়ে অপপ্রচার করত- অশিক্ষিত লোকদের মধ্য থেকে এ শিক্ষিত লোকটি অন্য ধর্মের বই-পুস্তক থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেগুলোকে নতুন আঙ্গিকে আমাদের নিকট প্রচার করছে। ফলে সমাজের লোকদের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক হত। কিন্তু যখন তিনি অশিক্ষিত কিংবা কোন বই-পুস্তক পড়তে ও লিখতে অপারগ হবেন, তখন এমন সন্দেহের কোন অবকাশ থাকবে না। সুতরাং এ বিষয়টি রাসূলের (সা.) জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত ছিল। যাতে মানুষের মধ্যে এমন বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, রাসূল (সা.) যা কিছু প্রচার করছে তা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে দীক্ষিত ও আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
‘তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে প্রেরণ’ এ বাক্যের অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ এ অঞ্চলসমূহ তথা মক্কা ও পার্শ¦বর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী লোকদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে উত্থিত করেছেন। অর্থাৎ কোন অনারব ব্যক্তি, কোন ইরানি, কোন আফ্রিকান, কোন রোমীয় কিংবা কোন চীনাকে নবুয়তের দায়িত্ব দিয়ে এ অঞ্চলে প্রেরণ করা হয় নি। আমি পূর্বেকার আলোচনাতেও এমন সম্ভাবনার প্রতি ইশারা করেছিলাম এবং আমার নিকট এ বিষয়টি তুলনামূলক বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে যে, ‘তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে প্রেরণ’ এ বাক্যের মাধ্যমে বুঝান হয়েছে- মক্কা ও পার্শ¦বর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী লোকদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে উত্থিত করা হয়েছে। এমনটি ছিল না যে, কোন ইরানিকে রেসালতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করে মক্কায় প্রেরণ করা হয়েছে। অথবা রোমীয় কিংবা আফ্রিকান কাউকে নবুয়তের দায়িত্ব দিয়ে আরবদের মাঝে ইসলাম প্রচারের আদেশ দেয়া হয় নি। বরং মক্কার অধিবাসীদের মধ্য থেকে একজনকে এ গুরুদায়িত্বে মনোনীত করা হয়েছে। যদি ‘তাদেরই মধ্য থেকে’ এ বাক্যের অর্থ এমনটি হয়ে থাকে, তাহলেও সেক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ এক অনুগ্রহ বলে গণ্য হয়। কেন? কারণ যদি আল্লাহ তায়ালা অন্য কোন অঞ্চল কিংবা সম্প্রদায় থেকে কাউকে রাসূল মনোনীত করে মক্কায় প্রেরণ করতেন, তবে সেখানকার গোঁড়া মানসিকতার লোকেরা কখনও তাকে মেনে নিত না। পারস্যের কোন অনারব ব্যক্তি সেখানে যেয়ে যদি তাদের নিকট ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাত, তবে তাদের পক্ষ থেকে সে আহ্বানের প্রতি সাড়া দেওয়ার আদৌ কোন সম্ভাবনা ছিল না।
তদানীন্তন আরব ভূখণ্ডে যে সাম্প্রদায়িক চিন্তার এবং দাম্ভিক ও গোঁড়া মানসিকতার লোকেরা বসবাস করত, যদি কোন ইরানি কিংবা অনারব নবুয়তের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে যেত, তবে কোন অবস্থাতেই তারা তাকে মেনে নিত না। একজন আরব যাকে স্থানীয়রা চিনত, তাঁর পিতা ও পিতামহকে চিনত, পরিবার ও পরিজনকে জানত, তাঁর পারিবারিক মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে অবহিত ছিল, একজন পুরাদস্তুর আরব হওয়া সম্পর্কে ভালভাবে জ্ঞাত ছিল, তাঁর অতীত জীবন সম্পর্কে অবহিত ছিল, সচ্চরিত্রবান হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল এবং বংশীয় মর্যাদাও তাদের নিকট অজানা ছিল না। এক কথায় বলা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা রাসূলের (সা.) মধ্যে সব ধরনের মহিমান্বিত গুণাবলির সমারোহ ঘটিয়েছিলেন; যাতে একগুঁয়েমি ও গোঁড়া মানসিকতাসম্পন্ন আরব সমাজের লোকেরা তাঁকে সহজেই মেনে নিতে পারে। কিন্তু তদুপরি তাদের একটি বড় অংশ প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁকে রাসূল হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। হ্যাঁ, এটি একটি সম্ভাব্য অর্থ, যে সম্ভাব্য অর্থের আলোকে ‘তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে প্রেরণের’ বিষয়টি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্যতম নেয়ামত ও অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচিত।
‘তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে’ এ বাক্যের অন্যতম সম্ভাব্য অর্থ হচ্ছে সমাজের সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে উত্থিত করা। আর ‘উম্মীদের’ বলতে মক্কার অভিজাত ও ধনিক শ্রেণী নয়; বরং সাধারণ শ্রেণী, যারা কোথাও যায় নি এবং কারও সাথে কোনরূপ সম্পর্ক গড়ে তোলারও সুযোগ পায় নি। কেননা আবু সুফিয়ান, আবু লাহাব প্রমুখ মক্কা ও তায়েফের ধনাঢ্য ও বিত্তশালী লোকেরা বিভিন্ন অঞ্চল সফর করত এবং অনেকের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলত। অথবা যারা ভিন্ন অঞ্চল থেকে মক্কায় আসত তাদের সাথেও এ অভিজাত শ্রেণীর লোকদের যোগাযোগ গড়ে উঠত। ফলে এমন যোগাযোগের মাধ্যমে পরস্পরের চিন্তা-ভাবনা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হত। পক্ষান্তরে সাধারণ শ্রেণীর লোকেরা এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এক কথায় ‘উম্মী’ হচ্ছে সমাজের মধ্যমশ্রেণীর লোক; আর যে শ্রেণী থেকে একজনকে রাসূলরূপে উত্থিত করা হয়েছে।
যদিও এ বিষয়টি সর্বজনবিদিত সত্য যে, রাসূল (সা.) মক্কার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাবান পরিবারের সন্তান। তার পিতা হযরত আব্দুল্লাহ, দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব, তার পিতা হাশিম ও তার পিতা আব্দে মানাফ এমন ক্রমধারা মোতাবেক এ বংশের প্রত্যেকেই যেভাবে কুরাইশ গোত্রের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তেমনভাবে মক্কার সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। বস্তুত তাদের কেউ যমযম কুপের দায়িত্বশীল, কারও নিকট কা’বা গৃহের চাবি আবার কেউ বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূল (সা.) পার্থিব জীবনের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ অবস্থাতে ছিলেন। পার্থিব দিক থেকে তিনি কষ্ট ও দুঃখের মধ্য দিয়েই জীবন অতিবাহিত করতেন। ধনাঢ্য ও বিত্তশালীদের মত তাঁর জীবনধারা ছিল না। কেবলমাত্র হযরত খাদিজার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর এ মহীয়সী রমনীর ধন-সম্পদ তাঁর আয়ত্তাধীন হওয়ার পর তিনি সম্পদশালী হন। হযরত খাদিজার বাণিজ্যিক ধনভাণ্ডার বাদ দিলে আর্থিক দিক থেকে তিনি ছিলেন অসচ্ছল। যৌবনের শুরুতে তিনি হযরত খাদিজার বাণিজ্যিক কাফেলার বেতনভুক্ত কর্মচারী ছিলেন, পরবর্তীতে তিনি তার স্বামী হন। সুতরাং রাসূল (সা.) সমাজের সাধারণ শ্রেণীর লোকদের মধ্য থেকে মনোনীত হয়েছেন। আর এ বিষয়টিও আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্যতম নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু কেন? কারণ যখন কেউ সমাজের সাধারণ শ্রেণীর মানুষদের মধ্য থেকে উত্থিত হবে, তখন মানুষ খুব সহজেই তার নিকটবর্তী হতে পারবে কিংবা তার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। কাজেই এ বিষয়টি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে গণ্য। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণীকে মানুষের নিকট পৌঁছে দিবে, মানুষকে দিকনির্দেশনা দান করবে এবং মানুষের সমস্যাদির সমাধান করবে; তাকে অবশ্যই মানুষের নাগালের মধ্যে থাকতে হবে, যাতে মানুষ খুব সহজেই তাকে কাছে পায় এবং নিজেদের আপনজন মনে করতে পারে।
ঘটনাক্রমে অতীতকাল থেকেই আমাদের আলেম-উলামাগণও (যারাও সমাজের মানুষের হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার পতাকাবাহী) অনুরূপ অবস্থার অধিকারী ছিলেন; অবশ্যই এমনটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়। আলেমদেরকে সমাজের মানুষের পাশে থাকা উচিত। মানুষের পাশে থাকা এবং তাদের আস্থা অর্জনের মত নেয়ামত ও সম্পদ পৃথিবীর কোন নেয়ামত ও সম্পদের সাথে তুলনাযোগ্য নয়। আর এ নেয়ামত আলেম-উলামা, ইসলামি চিন্তাবিদ ও মনীষীদের আয়ত্তাধীন। আমরাও চাই এ নেয়ামত ও এ সম্পর্ক যাতে সব সময়ের জন্য অটুট থাকে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব সফলতার অন্যতম কারণ ছিল, এ বিপ্লবের রচয়িতা তথা ইমাম খোমেনী (রহ.) ছিলেন একজন হাক্কানি আলেম, একজন শীর্ষ মারজায়ে তাকলীদ; সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করত; তবে সে শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভিত্তি ছিল ধর্মীয়, পার্থিব না। বর্তমানেও একই অবস্থা বহাল রয়েছে; অর্থাৎ এ বিপ্লবের বর্তমান কর্ণধারের প্রতি মানুষ নিজেদের আকিদাগত শ্রদ্ধা নিবেদন করে। ইসলামি বিপ্লবের সূচনালগ্নে যেমন ছিল, বর্তমানেও অনুরূপ অবস্থা বিদ্যমান।
সুতরাং আলেম সমাজকে সব সময় মানুষের সাথে এবং তাদের পাশে থাকা উচিত; তাদেরকে আপনজন হিসেবে সম্বোধন করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ও তাদের সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়কে তাদের সম্মুখে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরী। যদি সে বিষয়াবলি যথোপযুক্ত হয়ে থাকে, তবে মানুষও সেগুলোর যথার্থতা বুঝতে পারবে। আলেমরা যেমনভাবে মানুষের আপনজন, তেমনভাবে ভ্রাতৃতুল্য, এবং পরস্পরের আস্থাভাজন। তারা একে অপরকে অনুধাবন করেন এবং পরস্পরের ভাষা বুঝেন। যেমনভাবে আলেমরা জনগণকে আপন করে কাছে টানেন, তেমনভাবে জনগণও আলেমদের প্রতি ভক্তিপোষণ করে এবং তাদের দিকনির্দেশনা মেনে চলে। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের আলেম সমাজ এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অতীতকাল থেকেই ইরানের আবহমান সংস্কৃতিতে জনগণ ও আলেমদের মধ্যে পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। মসজিদ জনগণের মিলনের ও আস্থার স্থল; যা হচ্ছে আলেমদের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রধান ঘাটি। যেমনভাবে আলেমরা এখানে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তেমনভাবে সমাজের লোকেরাও এখানে আলেমদের সংস্পর্শে এসে স্বস্তিবোধ করে। মসজিদ যেমনভাবে আলেমের ধর্মীয় তৎপরতার কেন্দ্রস্থল, তেমনভাবে জনগণের শান্তি ও স্বস্তির স্থান। মসজিদ কোন ব্যক্তি কিংবা বিশেষ গোষ্ঠির একক নিয়ন্ত্রণাধীন কোন প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সবার জন্য উন্মুক্ত এবং সবাই সেখানে সমবেত হতে পারে। ফলে একজন আলেম বা মুবাল্লিগ অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে এবং লোকদের বোধগম্য ভাষাতে ধর্মীয় বক্তব্য তুলে ধরেন; আর মানুষও সাগ্রহে ও অত্যন্ত সহজভাবে সেগুলো গ্রহণ করতে পারে।
অতএব আল্লাহ তায়ালা সমাজের সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে একজনকে নবি হিসেবে মনোনীত করে রেসালতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেছেন, তা মানবজাতির জন্য বিশেষ নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত। অবশ্য ইতিহাসের বর্ণনামতে পাওয়া যায় যে, তখনও একশ্রেণীর লোক ছিল যারা প্রচার করত- যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রত্যাদেশ নাযিল হয়, তবে তা অলৌকিক কোন সত্তার মাধ্যমে প্রচার হওয়া জরুরী। আবার একশ্রেণীর লোক ছিল যারা ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই (ইসলামের বিরোধিতার নিমিত্তে) রাসূলকে (সা.) কটাক্ষ করে এমন মন্তব্য করত- যদি আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন, তবে কেন ফেরেশতা হন নি। অর্থাৎ তারা এ বিষয়টি মেনে নিতে পারে নি যে, একজন মানব আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। আল কুরআনের ভাষায় তাদের এহেন মন্তব্যকে এভাবে তুলে ধরা হয়েছে,
وَقَالُوا مَالِ هَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ
“আর তারা বলে ঃ এ কেমন রাসূল যে, আহারও করে, আবার হাটে-বাজারেও চলাফেরা করে?”
মজার বিষয় হচ্ছে আল্লাহ এ সংশয়বাদিদের এমন অজুহাতের প্রতি উত্তরে বলেন,
وَلَوْ جَعَلْنَاهُ مَلَكًا لَّجَعَلْنَاهُ رَجُلاً وَلَلَبَسْنَا عَلَيْهِم مَّا يَلْبِسُونَ
“আর যদি আমরা তাকে (এ রাসূলকে) ফেরেশতা করতাম, তবে তাকেও পুরুষের আকৃতিতে রূপদান করতাম। (তখনও) তারা ঐ সংশয়াচ্ছন্ন হত, এখন যে সংশয় প্রকাশ করছে।” অর্থাৎ আল্লাহ যদি মানবাকৃতির কোন ফেরেশতাকেও রাসূল হিসেবে মনোনীত করতেন; তখনও সংশয়বাদিরা নতুন সংশয় প্রকাশ করে, রেসালতকে অস্বীকার করত। আর ফেরেশতাদের তো মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ হওয়া সম্ভব নয়; মানুষ কেবল মানুষের সাথেই আন্তরিক হতে পারে। কাজেই উপসংহারে বলা যায় যে, ‘তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে প্রেরণ’ এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচিত।



























