ইহুদিবাদী ইসরাইলী সরকার কয়েক দশক ধরে জেরুজালেমের আল-কুদসে, বিশেষ করে আল-আকসা মসজিদ এবং এর আশেপাশে ব্যাপক খননকাজ চালিয়ে আসছে, যার লক্ষ্য পবিত্র নগরীর পরিচয় বদলে ফেলা, এটিকে ‘ইহুদিকরণ’ করা এবং ইসলামি স্থাপনা ধ্বংস করা।
আল জাজিরার বরাতে জানা যায়, আল-আকসা মসজিদের নিচে ও আশপাশে বিভিন্ন পর্যায়ে খনন কাজ চলছে। তবে ১৯৬৭ সালের জুনের যুদ্ধে ইসরাইলের ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক আল-কুদস দখলের পর থেকে এর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং এল-আদসহ কয়েকটি বসতি স্থাপনকারী সংগঠনের অর্থায়নে এসব খননকাজ ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক নির্মাণ চলছে।
সুনির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও ইসরাইলী বিবরণে দাবি করা হয়, এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য হলো কথিত ‘দাউদের নগরী’র অবশিষ্টাংশ খুঁজে বের করা। সুড়ঙ্গগুলোকে প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে দখলদার কর্তৃপক্ষ সেখানে অডিও-ভিডিও প্রদর্শনীসহ কথিত মন্দিরসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচিরও আয়োজন করে।
আল–কুদসে প্রথম খনন অভিযান
১৮৬৩ সালে ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ দ্য সুশির নেতৃত্বে আল-কুদসে প্রথম খনন অভিযান শুরু হয়। তারা পুরনো শহরের দেয়ালের বাইরে রাজাদের সমাধি আবিষ্কার করে দাবি করেন, এগুলো দাউদের আমলের, যা ইহুদিরা প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বলে মনে করে।
চার বছর পর, ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ প্যালেস্টাইন এক্সপ্লোরেশন ফান্ড কর্নেল চার্লস ওয়ারেনের নেতৃত্বে অসংখ্য স্থানে ব্যাপক খননকাজ শুরু করে। এসব খননকাজ কথিত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে আল-আকসা মসজিদ এলাকা ও সিলওয়ান মহল্লায় কেন্দ্রীভূত ছিল।
একই সময়ে, জার্মান প্রকৌশলী কনরাড শিক, প্যালেস্টাইন এক্সপ্লোরেশন ফান্ডের সহযোগিতায়, বেশ কয়েকটি খননকাজ পরিচালনা করেন, যেখানে সলোমনের গুহা, বেথেসদা পুল এবং রোমান জলপ্রবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো উন্মোচিত হয়।
এসব খনন কাজ পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে চলতে থাকে। ১৯৬৭ সালে ইসরাইলী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক আল-কুদস দখলের পর, ইসরাইলের ধর্মীয় সেবা বিষয়ক মন্ত্রণালয় আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের পশ্চিম দেয়ালের নীচে ব্যাপক খননকাজ শুরু করে, যা উত্তর দিকে উমাইয়া প্রাসাদের এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সময়ের সাথে সাথে, এই খননকাজগুলো গভীর এবং বিস্তৃত সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।
আল-কুদস বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানান, আল-আকসা মসজিদের নিচে ও আশপাশে বহু সুড়ঙ্গ ও খননকাজের অস্তিত্ব রয়েছে। এসব সুড়ঙ্গের কিছু মসজিদের মূল ফাউন্ডেশনের প্রায় ৯ মিটার নিচে শিলাস্তর পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা মসজিদের কাঠামোর স্থায়িত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।বেশিরভাগ খনন কাজ এবং এর চলমান কার্যক্রমের গোপনীয়তার কারণে, এই সুড়ঙ্গগুলির সঠিক পরিমাণ নথিভুক্ত করা কঠিন।

১৯৬৭ সালের শেষের দিকে, হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় আল-আকসা মসজিদের দক্ষিণ দেয়ালের নীচে ব্যাপক খননকাজ শুরু করে, যার দৈর্ঘ্য ৭০ মিটার এবং গভীর ১৪ মিটার। এতে নারীদের নামাজ কক্ষ, ইসলামিক জাদুঘর এবং আল-ফাখরি মিনার অন্তর্ভুক্ত ছিল।এসব খননের ফলে দক্ষিণ দেয়াল এবং মসজিদের কিছু অংশে ফাটল দেখা দেয়। খননকালে, রোমান এবং বাইজেন্টাইন নিদর্শন ছাড়াও, উমাইয়া আমলের ইসলামিক নিদর্শনগুলোও আবিষ্কৃত হয়েছিল।
পরবর্তীতে, দখলদাররা খননকাজ আরও ৮০ মিটার প্রসারিত করে এবং মসজিদের উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মাগারবেহ এলাকায় পৌঁছে। ১৯৭৩ সালে, আল-আকসা মসজিদের দক্ষিণ-পূর্বে খননকাজ শুরু হয়, যা এক বছর ধরে চলতে থাকে। খননকাজটি মসজিদের দক্ষিণ দেয়াল ভেদ করে পূর্ব দিকে প্রায় ৮০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
১৯৮১ সালের ২১শে আগস্ট, দখলদার ইসরায়েলিরা বাব আল-কাত্তানিন থেকে গম্বুজুল সাখরা পর্যন্ত পূর্ব দিকে বিস্তৃত একটি সুড়ঙ্গ পুনরায় খুলে দেয়। ১৮৬৭ সালে কর্নেল ওয়ারেন এই সুড়ঙ্গটি আবিষ্কার করেন। খননকাজটি আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের কায়তাবাই কূপ পর্যন্ত পৌঁছালে আল-কুদসের বাসিন্দারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে।
সুড়ঙ্গটি আরও বিস্তারের উদ্দেশ্যে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল গম্বুজুল সাখরার ভিত্তিতে পৌঁছানো। কিন্তু মসজিদের পশ্চিম বারান্দায় ফাটল দেখা দিলে ইসলামি ওয়াক্ফ প্রশাসন এতে হস্তক্ষেপ করে এবং কাঠামোগত ক্ষতি রোধ করার জন্য শক্তিশালী কংক্রিট দিয়ে এর প্রবেশপথটি বন্ধ করে দেয়।
আল–আকসা প্রাঙ্গণের নিচে খনন
খনন পরিকল্পনার মধ্যে ছিল ওপরের মাটি সমতল করা এবং কথিত মন্দিরের মানচিত্র আঁকা—যা মূলত আল-আকসা প্রাঙ্গণের নিচের এলাকায় দখল বিস্তারের পরিকল্পনার অংশ । ইসরায়েইলের সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বসতি স্থাপনকারী সংস্থাগুলির পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিকরা আল-আকসা মসজিদের চারপাশে খননকাজে অংশগ্রহণ, সমর্থন এবং তত্ত্বাবধান করেছে।
দখলদারদের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
আল-কুদসে ইহুদিদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি প্রমাণ করার জন্য ইহুদি পুরাকীর্তি অনুসন্ধান।
তৃতীয় মন্দির নির্মাণের ধারণা প্রচারের জন্য প্রথম বা দ্বিতীয় মন্দিরের প্রমাণ অনুসন্ধান।
উমাইয়া প্রাসাদের আশেপাশে আল-আকসার দেয়ালে খননকাজ সম্প্রসারণ।
আল-কুদস সম্পর্কে ইসরাইলী বর্ণনাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলিকে হিব্রু যুগের সাথে সংযুক্ত করে একটি মনগড়া হিব্রু ইতিহাস তৈরি করা।
আল-আকসা মসজিদের আশেপাশের এলাকাকে ইহুদিকরণ করা এবং এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলো লুকিয়ে রাখা।
ইসলামী ও আরব পুরাকীর্তি মুছে ফেলা এবং ধ্বংস করা।
ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আকৃষ্ট করে শহরের ইহুদিকরণকে সুসংহত করা।
আল-কুদসে একটি ঐতিহাসিক ইহুদি শহর তৈরি করা।
আল-আকসা মসজিদের নিচে সিনাগগ এবং তালমুদীয় মাজার নির্মাণ।
আল-আকসা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এর কাঠামো দুর্বল করা
মাটির উপরে এবং নীচে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা।
ইসরাইলী খননের ঝুঁকি
আল-আকসা মসজিদের ভিত্তিতে গুরুতর ক্ষতি ও সম্ভাব্য ধসের ঝুঁকি
আল-কুদসের আরব-ইসলামি ইতিহাস মুছে ফেলার প্রচেষ্টা
খননে পাওয়া ইসলামি, খ্রিস্টান ও আরবি পুরাকীর্তি চুরি
আরব ও ইসলামি যুগের প্রাচীন স্তর ধ্বংস
ইহুদিবাদী প্রকল্পের স্বার্থে আল-আকসা মসজিদের আওতাধীন এলাকাকে বসতি স্থাপনের সুবিধায় রূপান্তর।
২০১৬ সালের ৭ এপ্রিল আল-আকসা মসজিদের পরিচালক শেখ ওমর আল-কিসওয়ানী জানান, ইসলামি ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষ এসব খননকাজ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং জর্ডানের আওকাফ মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করছে, যাতে খননকাজ এবং পুরাকীর্তি ধ্বংস বন্ধে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা যায়।২০১৭ সালের জুলাই মাসে, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি আল-কুদসে ইসরায়েলি পুরাকীর্তি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত খননের নিন্দা জানায়।



























