সাইদুল ইসলাম: ইসলামের ইতিহাসে আহলে বাইতের ইমামগণ মানবজাতির জন্য নৈতিকতা, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁদের জীবন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার চিরন্তন প্রেরণা। এই মহান ব্যক্তিত্বদের মধ্যে চতুর্থ মা’সুম ইমাম, ইমাম আলী জয়নুল আবেদীন (আ.) ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি চরম নিপীড়ন ও অমানবিকতার যুগে ইবাদত, দোয়া ও চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের প্রাণশক্তিকে অটুট রেখেছিলেন।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর প্রকৃত নাম ছিল আলী। তাঁর উপাধি ‘জয়নুল আবেদীন’ অর্থাৎ ইবাদতকারীদের অলংকার এবং ডাকনাম ছিল আবু মোহাম্মদ। তিনি ৩৬ হিজরিতে মদীনা মুনাওওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন কারবালার মহান শহীদ, ইমাম হোসাইন (আ.) এবং মাতা শাহর বানু—পারস্যের সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগের্দ এর কন্যা। এভাবে তিনি নবুয়তের পবিত্র বংশধারা ও সম্ভ্রান্ত মানবিক ঐতিহ্যের এক অনন্য উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন।
শৈশবেই তিনি দাদা হযরত আলী (আ.) এবং চাচা ইমাম হাসান (আ.)-এর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন। ৬১ হিজরিতে সংঘটিত কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনায় তিনি কিশোর বয়সে উপস্থিত ছিলেন। অসুস্থতার কারণে যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও, নিজের চোখের সামনে পিতা ইমাম হোসাইন (আ.), ভাই, চাচা ও আহলে বাইতের প্রিয়জনদের একে একে শাহাদাত বরণ করতে দেখেন। এই শোকাবহ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তাঁকে ধৈর্য, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতির সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করে।
পিতার শাহাদাতের পর ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সময়কাল ছিল উমাইয়া শাসকদের চরম স্বৈরাচার ও নিপীড়নের যুগ। আহলে বাইতের অনুসারীদের ওপর নির্যাতন, হত্যা ও নজরদারি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ইমামকে প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ, ভাষণ কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এমনকি নির্বিঘ্নে ইবাদত করাও ছিল কঠিন। এই পরিস্থিতিতে তিনি তলোয়ার নয়, বরং চরিত্র, ধৈর্য ও দোয়াকে অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।
ইবাদতের ক্ষেত্রে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) ছিলেন অতুলনীয়।তিনি এত বেশি আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকতেন যে, ওযু করার সময় তাঁর চেহারায় পরিবর্তন ঘটত, নামাযে দাঁড়ালে আল্লাহর ভয়ে তাঁর গোটা অবয়বে কম্পন শুরু হতো। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দিতেন : ‘তোমরা কি জান না, কার সামনে আমি নামাযে দাঁড়াই? কার সাথে কথা বলি?’
নিপীড়নের সেই অন্ধকার সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য সম্পদ রেখে যান—‘আস-সহিফা আস-সাজ্জাদিয়া’। এই দোয়া সংকলন শুধু প্রার্থনার গ্রন্থ নয়; বরং তাওহিদ, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক চেতনার এক জীবন্ত দলিল। এ কারণেই একে ‘যাবুরে আলে মুহাম্মাদ’ বলা হয়। তাঁর দোয়ার ভাষা আজও মানুষের হৃদয়ে ঈমান ও আল্লাহপ্রেম জাগ্রত করে।
ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) ছিলেন নিঃশব্দ দানশীলতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তিনি রাতের আঁধারে নিজের পিঠে খাদ্যসামগ্রী বহন করে দরিদ্রদের ঘরে পৌঁছে দিতেন, যাতে কেউ তাঁকে চিনতে না পারে। তাঁর শাহাদাতের পর মানুষ বুঝতে পারে—যে নীরব দাতা এতদিন তাদের পাশে ছিলেন, তিনি আর নেই। এমনকি শত্রুদের প্রতিও তিনি মানবিকতা ও সদুপদেশ প্রদানে কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
৯৫ হিজরির ২৫ মুহররম, উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদের নির্দেশে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে এই মহান ইমামকে শহীদ করা হয় বলে ইতিহাসে বর্ণিত আছে। ৫৮ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন এবং মদীনার জান্নাতুল বাকীতে সমাহিত হন। দীর্ঘ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ইমামতের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করে গেছেন—ইসলাম শুধু সংগ্রামের নয়, ধৈর্য ও আত্মিক সাধনারও ধর্ম।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) ছিলেন কারবালার রক্তঝরা ইতিহাসের নীরব ধারক ও বাহক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—সব সময় উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ নয়, কখনো নীরবতা, দোয়া ও চরিত্রের দৃঢ়তাই সত্যকে বাঁচিয়ে রাখে। ইবাদত, মানবপ্রেম ও আল্লাহভীতির এই মহান আদর্শ যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন প্রেরণা হয়ে থাকবে।


























