ইসলামের ইতিহাসে আলী ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্ব ও ন্যায়পরায়ণতা অনন্য। তিনি শুধু নিজের সামর্থ্য ও ক্ষমতায় সন্তুষ্ট থাকতেন না, বরং তার শাসনকে আল্লাহর নির্দেশনা ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। মিশরের গভর্নর মালিক ইবনে হারিস আশতারের উদ্দেশ্যে নেতৃত্বের করণীয় ও নৈতিক নির্দেশনা প্রদান করে তিনি যে চিঠি দিয়েছেন তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শাসকের কর্তব্য শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ নয়, বরং আল্লাহর ভয় ও বিধানের প্রতি অঙ্গীকারের মাধ্যমে নিজের আচরণ ও প্রশাসনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। আলী ইবনে আবু তালিব নির্দেশ দিয়েছেন যে শাসককে কেবল নিজের বাসনা ও অহংবোধের দাস হতে হবে না, বরং জনগণের কল্যাণ ও ন্যায়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে।
এতে প্রতিপাদিত হয়েছে যে, একটি দেশের শাসনকাল তার জনগণের নজরদারি ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে মূল্যায়িত হয়। অতীত শাসকদের ভুল ও সাফল্য পরবর্তীদের জন্য শিক্ষা ও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ শাসককে আল্লাহর নির্দেশনার আলোকে আত্মসচেতন হতে হবে এবং ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
এই চিঠি শুধুমাত্র প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; এটি একটি নৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শিক্ষাও। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, শাসনের সাফল্য কেবল ক্ষমতার প্রয়োগে নয়, বরং নৈতিকতা, সততা ও জনগণের কল্যাণে নিহিত।
একজন আল্লাহর বান্দা আলী ইবনে আবু তালিবের পক্ষ থেকে মিশরের ভাবী গভর্নর মালিক ইবনে হারিস আশতারের প্রতি- নেতৃত্বের করণীয়
মালিক, আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ প্রদান করছি, জীবনের সর্ববিধ কাজে আল্লাহ এবং তাঁর প্রদত্ত ব্যবস্থাকে সবার ওপরে স্থান দেবে। তাঁর স্মরণ ও ইবাদতকে অগ্রাধিকার দান কর। কুরআনের নির্দেশ ও নবীর শিক্ষাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অনুসরণ করবে। এ সমস্ত নির্দেশ প্রতিপালনের ওপরই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নির্ভরশীল। যারা এটা অমান্য করে তাদের জন্য রয়েছে চিরকালীন অভিশাপ। আল্লাহর নির্দেশ পালনে অপারগতার পরিণতি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় জীবনেই চরম ব্যর্থতা বয়ে আনবে। সুতরাং তোমাকে অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত মূলনীতিগুলোকে মেনে চলতে হবে, আল্লাহর উদ্দেশ্যকে সমর্থন দিতে হবে এবং তাঁর নির্দেশগুলো বাস্তবায়িত করতে হবে, কেবল এভাবেই তুমি আল্লাহর সাহায্য, অনুগ্রহ ও রহমতের যোগ্য হতে পার।
আমি তোমাকে আদেশ করছি মালিক, তোমার মন-মগজ, হাত ও কণ্ঠ এবং তোমার সমগ্র সত্তা দিয়ে আল্লাহর সৃষ্টির সহায়তা করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন তোমাদের কামনা ও বাসনা নিয়ন্ত্রিত করতে, তোমার আত্ম ও অহংবোধের লাগাম টেনে ধরতে, বিশেষ করে যখন কামনার পাগলা ঘোড়া তোমাদের শঠতা ও পাপের দিকে তাড়িয়ে নিতে উদ্যত হয়। তোমার আত্মবোধ ও তার আকাঙ্ক্ষা তোমাকে প্রতিনিয়ত অধঃপতন ও অবমাননার দিকে প্ররোচিত, উতসাহিত ও জোর করে ঠেলে নিয়ে যেতে চায়।
মালিক, আমি তোমাকে এমন একটি দেশের প্রশাসক করে পাঠাচ্ছি যা অতীতে নীতিহীন ও ন্যায়পরায়ণ, নিপীড়ক ও প্রজাতিতেষী, নিষ্ঠুর ও হৃদয়বান, অত্যাচারী ও দয়ার্দ্র এ সব ধরনের সরকারই প্রত্যক্ষ করেছে।
জনগণ পূর্ববর্তী শাসনগুলোকে যেভাবে নিরীক্ষণ করেছে ঠিক একই রকম সূক্ষ্মভাবে তারা তোমার প্রশাসনকেও বিচার করবে। তুমি পূর্ববর্তী শাসকদের সমালোচনা করছ, যদি তুমি আত্মসচেতন না হও তবে তুমি তাদের সম্পর্কে যা বলছ তারাও তোমার সম্পর্কে একই কথা বলবে।
একজন সৎ ও ভালো মানুষের পরিচয় পাওয়া যায় তার সম্পর্কে ভালো কথা যা বলা হয় এবং অপরের কাছ থেকে যে প্রশংসাগুলো আল্লাহ তার জন্য নসীব করেন (তা থেকে)। মনে রেখ যে, ক্ষমতাসীন লোকদের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিচার তাদের বংশধরদের দ্বারা তার কৃতকর্মের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
অতএব, তুমি তোমার মনকে মহৎ চিন্তা, সদুদ্দেশ্য, সদিচ্ছা ও সৎকর্মের ঝরনাধারার উতসমূল করে তোল। সৎকাজের হিসাব বাড়িয়ে তোলাই যেন হয় তোমার সবচেয়ে বড় চিন্তা। এতে তুমি সফল হতে পার তোমার কামনা-বাসনাকে লাগামছাড়া হতে না দিয়ে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থেকে।
মনে রেখ যে, নিজের প্রতি সুবিচার করার এবং ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে পাপকাজ থেকে বিরত থাকা এবং অসৎ বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করা।



























