ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে অন্তত ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের জন্য প্রস্তুত করা কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস)–এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ কিছু ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনো গোপন রাখা হয়েছে এবং কয়েকটি ঘটনার তদন্ত চলমান রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক ও ব্যয়বহুল সামরিক প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে ৪টি F-15E Strike Eagle যুদ্ধবিমান, ১টি F-35A Lightning II স্টিলথ ফাইটার জেট, ১টি A-10 Thunderbolt II আক্রমণ বিমান, ৭টি KC-135 Stratotanker জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, ১টি E-3 Sentry AWACS নজরদারি ও আকাশ নিয়ন্ত্রণ বিমান, ২টি MC-130J Commando II বিশেষ অভিযান বিমান, ১টি HH-60W Jolly Green II উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার, ২৪টি MQ-9 Reaper ড্রোন এবং ১টি MQ-4C Triton উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নজরদারি ড্রোন রয়েছে।
বিশেষ করে MQ-9 Reaper ড্রোনের ব্যাপক ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রোনের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ কোটি ডলার, যা দীর্ঘ-পাল্লার নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভুল হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইভাবে F-35A যুদ্ধবিমান হারানোও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ প্রতিটি বিমানের মূল্য প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি ডলার এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উন্নত স্টিলথ প্রযুক্তিসম্পন্ন যুদ্ধবিমান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি E-3 Sentry AWACS নজরদারি বিমান ধ্বংস হওয়ার ঘটনাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত ওই বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে, যা এএফপি যাচাই করেছে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সামরিক অভিযানের ব্যয় ইতোমধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত ১২ মে কংগ্রেসে এক শুনানিতে পেন্টাগনের অর্থপ্রধান জুলস হার্স্ট তৃতীয় বলেন, এই ব্যয়ের বড় অংশ এসেছে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত এবং নতুন করে প্রতিস্থাপনের হালনাগাদ হিসাব থেকে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। অভিযানে ব্যাপক বিমান হামলা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং সমুদ্রপথে সামরিক অভিযান চালানো হয়।
যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করছে, এই অভিযানে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প সক্ষমতার ৯০ শতাংশ এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতার ৮৫ শতাংশের বেশি ধ্বংস করা হয়েছে, তবে নিজেদের বিমান ক্ষতির এই হিসাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষয়ক্ষতি প্রমাণ করে যে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বধারণার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ছিল। বিশেষ করে উন্নত রাডার, দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার কারণে মার্কিন বাহিনী উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, দীর্ঘদিন পর এত বড় আকারে মার্কিন সামরিক বিমানের ক্ষয়ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল, প্রতিরক্ষা বাজেট এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।



























