যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে সাম্প্রতিক বন্দুক হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার পর দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এই ঘটনার পর ইসলামোফোবিয়া, ঘৃণাজনিত সহিংসতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় আরও সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন মুসলিম নেতারা।
মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা (ইকনা)-এর বার্ষিক সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আসা কয়েক হাজার মুসলিম অংশ নেন। বক্তারা বলেন, সান দিয়েগোর হামলা শুধু একটি উপাসনালয়ের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা ধর্মীয় বিদ্বেষের একটি উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার)-এর আইনি কর্মকর্তা লেনা মাসরি নিহতদের সাহসিকতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তাকর্মী আমিন আব্দুল্লাহ, তত্ত্বাবধায়ক মনসুর কাজিহা এবং স্থানীয় বাসিন্দা নাদির আওয়াদ হামলার সময় অন্যদের বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের দ্রুত পদক্ষেপে আরও বড় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয় বলে জানান তিনি।
সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে লেনা মাসরি মুসলিমদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “তারা আমাদের উপাসনার স্থান রক্ষা করেছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব নাগরিক অধিকার ও আইনি ক্ষেত্রগুলো আরও শক্তভাবে রক্ষা করা।” তিনি মুসলিমদের ভোটাধিকার প্রয়োগ, মানবাধিকার ইস্যুতে সক্রিয় থাকা এবং সামাজিক সংগঠনে অংশ নেওয়ার ওপর জোর দেন।
সম্মেলনে ফিলিস্তিন ইস্যুও গুরুত্ব পায়। গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেক অংশগ্রহণকারীকে ফিলিস্তিনি পতাকা, কেফিয়াহ এবং তরমুজ প্রতীকের ব্যাগ বহন করতে দেখা যায়, যা ফিলিস্তিনি সংহতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক আলতাফ হুসাইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতি এবং কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য মুসলিমদের মধ্যে ভয় ও অনিরাপত্তা তৈরি করছে। তবে তিনি মনে করেন, বিপুলসংখ্যক মানুষের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মার্কিন মুসলিমরা তাদের অধিকার ও পরিচয় রক্ষায় পিছু হটতে রাজি নয়।
সান দিয়েগো হামলার পর সংশ্লিষ্ট মসজিদের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রমও চলছে। বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ও নাগরিক অধিকার গ্রুপ নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং কমিউনিটি সুরক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি, ধর্মীয় বৈষম্য এবং মুসলিমবিরোধী বক্তব্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কিছু ডানপন্থী ভাষ্যকারের বিতর্কিত মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মুসলিম নেতারা বলছেন, ঘৃণাজনিত অপরাধ মোকাবিলায় শুধু নিরাপত্তা নয়, আইনি ও রাজনৈতিক সচেতনতাও জরুরি।
ইকনার সভাপতি সাদ কাজমি জানান, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায় এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। পাশাপাশি সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও সামাজিক আন্দোলনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সান দিয়েগোর হামলা যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় সহনশীলতা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি মুসলিম সম্প্রদায়কে আরও সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনে দিয়েছে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা



























