মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আহ্বান করা, বিভ্রান্তি থেকে হেদায়াতের দিকে পরিচালিত করা এবং নৈতিক ও আত্মিক উৎকর্ষতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব নিয়েই রাসূলুল্লাহ (সা.) এ পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর রেসালত কোনো সীমিত ধর্মীয় আচার কিংবা কেবল উপদেশমূলক কর্মসূচিতে আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল মানবজীবনের সর্বাঙ্গীণ সংস্কার ও পরিশুদ্ধির এক পরিপূর্ণ ঐশী পরিকল্পনা। আল্লাহ তায়ালা সূরা জুমুআ’র দ্বিতীয় আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর অর্পিত সেই মহান দায়িত্বসমূহকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন, যেখানে তাঁর দাওয়াতি মিশনের চারটি মৌলিক স্তম্ভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে—আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত, মানুষের পরিশুদ্ধি, ঐশী কিতাবের শিক্ষা এবং হিকমতের শিক্ষা।
এই চারটি দায়িত্বের মধ্যেই নিহিত রয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি কার্যক্রমের গভীরতা, ভারসাম্য ও বাস্তবতা। কুরআনের আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে আত্মিক ও নৈতিক পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মানব চরিত্র গঠন এবং কিতাব ও হিকমতের শিক্ষার মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত ও কল্যাণমুখী সমাজ বিনির্মাণ—সবকিছুই ছিল তাঁর নবুয়তের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আল্লাহ তায়ালা যখন রাসূলকে (সা.) রেসালতের গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত করে প্রেরণ করেছেন; তখন এ প্রশ্ন উত্থাপিত হবে যে, তাঁর প্রধান কাজ কি? উত্তরে বলব- সূরা জুমুআ’র দ্বিতীয় আয়াতে মহানবির (সা.) চারটি মূখ্য কাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যথা: এক- কুরআনের আয়াতসমূহ পাঠ, দুই- পরিশুদ্ধি, তিন- ঐশী কিতাবের শিক্ষা এবং চার- হিকমতের শিক্ষা। সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বীয় তাবলীগি কার্যক্রমে এ চারটি মূখ্য দায়িত্বকে এমনই ক্রমধারাতে সম্পন্ন করেছেন অথবা এ ক্রমধারা অনুসারে নাও হতে পারে। অবশ্য আমরা পূর্বেকার আলোচনাতে উল্লেখ করেছি যে, কুরআনের যেসব আয়াতে ঐশী কিতাবের শিক্ষা ও পরিশুদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব আয়াতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিশুদ্ধির কথা প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর ঐশী কিতাবের শিক্ষার বিষয় এসেছে। অবার কোন কোন ক্ষেত্রে পরিশুদ্ধির পূর্বে ঐশী কিতাবের শিক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যেমন নিম্নের আয়াতে বর্ণিত হয়েছে,
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ
“হে আমাদের প্রতিপালক! আর তাদের মধ্য থেকে তাদের জন্য এক রাসূল আবির্ভূত (ও উত্থিত) কর যে তাদের সম্মুখে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করবে, তাদেরকে ঐশী কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে।”
কিন্তু আমাদের আলোচ্য আয়াতে (সূরা জুমুআ’র দ্বিতীয় আয়াতে) প্রথমে পরিশুদ্ধি অতঃপর ঐশী কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষার বিষয় এসেছে। অবশ্য এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে উক্ত আয়াতটি হযরত ইবরাহীমের (আ.) পবিত্র মুখনিঃসৃত। পক্ষান্তরে আলোচ্য আয়াতটি মহান আল্লাহর ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। হয়তো এটাই তারতম্যের প্রধান কারণ। সর্বোপরি এখানে মূখ্য বিষয় হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর উপর অর্পিত এ চারটি দায়িত্ব সর্বাত্মক গুরুত্ব ও যথাযথ মনোনিবেশের মাধ্যমে সুসম্পন্ন করেছেন; এখন আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।
এক- কুরআনের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত
রাসূলুল্লাহর (সা.) সর্বপ্রথম দায়িত্ব ছিল يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ অর্থাৎ তাদের সম্মুখে আল্লাহর (কুরআনের) আয়াতসমূহ পাঠ করা। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সম্মুখে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করার মাধ্যমে রাসূলের (সা.) রেসালতের গুরুদায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। যখন তিনি কুরআনের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত শুরু করেন, তখন থেকে নবুয়ত ও রেসালতের কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। আল্লাহর আয়াত তথা বাণীসমূহ হচ্ছে প্রকৃত নিদর্শন। আমরা যখন বলি ‘কুরআনের আয়াত’, তখন এ বিষয়টি ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না যে, এ আসমানি কিতাবের প্রতিটি বাক্য (চাই তা ছোট হোক কিংবা বড়) এক একটি আল্লাহর নিদর্শনস্বরূপ। আয়াতের অর্থ হচ্ছে নিদর্শন। আমি, আপনি অথবা প্রত্যেকেই এক একজন আয়াতুল্লাহ তথা আল্লাহর নিদর্শন। কেননা আমার, আপনার, জীব-জন্তুর কিংবা পাহাড়-পর্বতের অস্তিত্বসমূহ আল্লাহর নিদর্শনস্বরূপ। এ বিস্তীর্ণ আসমান-জমিন এবং এগুলোর মাঝে বিদ্যমান সৃষ্টিজগতের অগণিত বস্তুসমূহ মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন বহন করে। আল কুরআনের প্রতিটি বাক্যও অনুরূপ। এ আসমানি কিতাবের প্রতিটি শব্দ ও বাক্য এতই সুমিষ্ট, সুন্দর, সূক্ষ্ম, অর্থবহ, গভীর চিন্তার উদ্রেককারী এবং সুউচ্চ মানের বিষয়বস্তুকে ধারণ করছে যে, যে কোন মানুষকে (এমনকি জিনদেরও) ভীষণভাবে আকৃষ্ট ও মোহিত করে; এগুলোর প্রত্যেকটি আল্লাহর নিদর্শনস্বরূপ।
সাধারণত কুরআনের প্রতিটি সূরার এক একটি বাক্যকে (যেগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সন্নিবেশিত) আয়াত বলা হয়। يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ অর্থাৎ তাদের সম্মুখে রাসূল (সা.) আল্লাহর (কুরআনের) আয়াতসমূহ পাঠ করতেন। কুরআনের আয়াতসমূহের তেলাওয়াতের মাধ্যমে রাসূলের (সা.) রেসালতের সূচনাপর্ব শুরু হয়। কেননা যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর বাণীকে মানুষের নিকট পৌঁছানো না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধর্মের কোন দাওয়াত তাদের দিকে পৌঁছাবে না। কাজেই এটা ইসলাম প্রচারের প্রারম্ভিক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য।
দুই- মানুষের পরিশুদ্ধি
রাসূলুল্লাহর (সা.) রেসালতের কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপ ছিল وَيُزَكِّيهِمْ অর্থাৎ মানুষকে পরিশুদ্ধ করণ। ‘তাযকিয়্যাহ’ বলতে বুঝায় পরিশুদ্ধি, পরিশোধন কিংবা উন্মেষণ। এ শব্দের মূল হচ্ছে ‘যাকাত’ তথা প্রবৃদ্ধি, উন্নতি, উন্মেষ প্রভৃতি। যখন মানুষ নিজের ধন-সম্পদের যাকাত প্রদান করে, তখন সে সম্পদের প্রবৃদ্ধি ও উত্তরণ ঘটে; এ কারণে ইসলামি পরিভাষায় এটাকে যাকাত বলা হয়। অনুরূপভাবে ‘তাযকিয়্যাহ’ অর্থাৎ পরিশুদ্ধি, উন্মেষ কিংবা উৎকর্ষ সাধন করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- উৎকর্ষ সাধন বলতে কি বুঝান হচ্ছে? উত্তরে বলব- মানবীয় অস্তিত্বে যেসব সুপ্ত প্রতিভা, সম্ভাবনা ও সক্ষমতা রয়েছে; সেগুলোর যথাযথ পরিশুদ্ধির মাধ্যমে উৎকর্ষ সাধন। একটি বৃক্ষের বিকাশ সাধন বলতে কি বুঝান হয়? উক্ত বৃক্ষের মধ্যে যত ধরনের সম্ভাবনা ও সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলোর প্রত্যেকটির উত্তরণ সাধন। অর্থাৎ যদি সে বৃক্ষের পাতা গজানোর সক্ষমতা থাকে, তবে পাতার বিকাশ সাধন, যদি ফলদানকারী বৃক্ষ হয়, তবে ফল দিবে, যদি গাছে ফুল দানের সক্ষমতা থাকে, তবে ফুলের বিকাশ ঘটাবে এবং গাছের শিকড় ও ডালপালা যা কিছু রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ প্রবৃদ্ধি সাধন। যখন এগুলোর প্রত্যেকটির যথাযথ প্রবৃদ্ধি ঘটবে, তখন একটি বৃক্ষের প্রকৃত উৎকর্ষ সাধিত হবে। অর্থাৎ একটি বৃক্ষের অভ্যন্তরে সুপ্ত অবস্থাতে বিদ্যমান যাবতীয় সক্ষমতা ও সম্ভাব্যতার যথাযথ বিকাশকেই সে বৃক্ষের সুষম বৃদ্ধি বলা হয়। কাজেই বৃক্ষের এমন সঠিক উৎকর্ষতা সাধনকে সে বৃক্ষের তাযকিয়্যাহ বলা যেতে পারে। একজন মালি যদি তার বাগানের গাছগুলোর তাযকিয়্যাহ তথা পরিচর্যা করতে চান, তবে সে এমন প্রক্রিয়াতে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন যাতে সেগুলোর যথাযথ বিকাশ হয়। মানুষও কিছু বিশেষ প্রতিভা, সক্ষমতা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী; নবি-রাসূলগণ মানুষের এসব বৈশিষ্ট্যকে যথাযথভাবে পরিচর্যার মাধ্যমে উৎকর্ষতা দান করেন।
অবশ্য নবি-রাসূলগণের যথাযথ দিকনির্দেশনা এবং হেদায়েতের কারণে মানুষ সঠিক পথের দিশারী লাভ করে। কেননা মানুষের মধ্যে যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলোকে যদি যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান ও পরিচর্যা করা না হয়; তাহলে মানুষ বিপথগামিতার শিকার হতে পারে। যেমন: মানুষের মধ্যে পাওয়ার আকাক্সক্ষা অনেক বেশি; যা কিছু তার নাগালের মধ্যে আসে, সেগুলোকে নিজের আয়ত্তাধীন করে রাখতে চায়। তাই এ আকাক্সক্ষার সঠিক প্রতিপালন প্রয়োজন; অর্থাৎ তাকে এমন দিকনির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন যাতে আকাক্সক্ষা কেবল ঐসব বৈধ ও নিয়মসিদ্ধ প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে যা তার সত্তার বিকাশের জন্য অপরিহার্য এবং সে তার সত্তার জন্য ক্ষতিকারক বিষয়াবলি থেকে আত্মসংবরণ করে। অর্থাৎ তার চাহিদা ও আকাক্সক্ষাসমূহকে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ এবং সীমালঙ্খন থেকে বিরত রাখা। এছাড়া মানুষের মধ্যে যে আধিক্যের লালসা আছে তা তাকে অন্যের অধিকার নষ্ট করতে প্ররোচিত করে। তাই এ আধিক্যের লালসা ও অতিরিক্ত কিছু কামনার প্রবণতা থেকে যে পরস্পরের অধিকার লঙ্ঘনে পর্যবসিত হয় তা আত্মপরিশুদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ এক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়া আবশ্যক। সুতরাং এগুলো সবই হচ্ছে মানুষকে সঠিক পথের হেদায়েত ও দিকনির্দেশনা; এ আত্মশুদ্ধি ও আত্ম সংশোধনের মাধ্যমেই মানুষ উৎকর্ষতা লাভে সক্ষম হয়।
সূরা জুমুআ’র তাফসীর থেকে নেয়া।



























