ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক উত্তেজনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও বারবার যুদ্ধের পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দুই-দেশ। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইরানের মাটিতে কিংবা ইরানকে কেন্দ্র করে একাধিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে “বেইজ্জতি” বা বড় ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থার মুখে পড়তে হয়েছে।
তেহরান দূতাবাস জিম্মি সংকট: ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের রাজধানী তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করে একদল বিপ্লবী ছাত্র। এই ঘটনা, যা ইরান জিম্মি সংকট নামে পরিচিত, যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ ৪৪৪ দিন চরম অস্বস্তিতে ফেলে রাখে। শক্তিধর দেশ হয়েও জিম্মিদের দ্রুত উদ্ধার করতে না পারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অপারেশন ঈগল ক্ল’র ব্যর্থতা : জিম্মিদের উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র চালায় গোপন সামরিক অভিযান অপারেশন ঈগল ক্লর। প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার-এর অনুমোদনে পরিচালিত এই মিশন ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়।
ইরানের মরুভূমিতে ধুলিঝড়, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সমন্বয়ের অভাবে অভিযান ভেঙে পড়ে। একটি হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানের সংঘর্ষে বিস্ফোরণে ৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। জিম্মিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি,বরং এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
২০১৯ মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত: ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশের অভিযোগে ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) একটি অত্যাধুনিক মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করে। ড্রোনটি ছিল আরকিউ-৪ গ্লোবাল হক।
এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেনি। বরং পরিকল্পিত হামলা শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। এতে অনেকেই মনে করেন, ইরানের সামনে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সংঘাত যুদ্ধবিমান ও উদ্ধার অভিযানের ব্যর্থতা: সংঘাতে ইরানে বিমান হামলা চালাতে গিয়ে নতুন করে বিপাকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। আইআরজিসির পাল্টা হামলায় একটি F-15 ইঙ্গল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার দাবি উঠে। একজন পাইলট নিখোঁজ হন এবং তাকে উদ্ধারের বিশেষ অভিযানেও জটিলতা দেখা দেয়।
উদ্ধার অভিযানে একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়া আরও দুটি যুদ্ধবিমান যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবংডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়ে।
সমর বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার অস্বস্তিকর অবস্থার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে: বিশাল মরুভূমি ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা আধুনিক রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ইরানের অভ্যন্তরীণ সমর্থন ও প্রতিরোধ মনোভাব সরাসরি সামরিক অভিযানের উচ্চ ঝুঁকি
ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস শুধু শক্তি প্রদর্শনের নয়, বরং একাধিক বিব্রতকর ব্যর্থতারও সাক্ষী। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে ১৯৮০ সালের ব্যর্থ অভিযান এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে ইরান বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলোই আজ “ইরানে আমেরিকার বেইজ্জতি” হিসেবে আলোচিত, যা ভবিষ্যতের সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইনকিলাব



























