ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সতর্ক করে জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান চালানো হলে তার জবাবে “ধ্বংসাত্মক ও অনুতাপজনক” প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
এই সতর্কবার্তা মঙ্গলবার ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক সমন্বয় কেন্দ্র খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর থেকে দেয়া হয়, যখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সামরিক কমান্ডের এক মুখপাত্র বলেন, “আমিরাতের মাটি থেকে ইরানের দ্বীপ, বন্দর বা উপকূল লক্ষ্য করে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলে আমরা ধ্বংসাত্মক ও অনুতাপজনক জবাব দেব।”
তিনি ইউএই তথা আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক দাবিগুলো স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন, যেখানে বলা হয়েছিল ইরান আমিরাতের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
মুখপাত্র বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এমন কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি,” এবং তিনি আমিরাতের দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি আরও বলেছেন, “যদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হতো, আমরা তা নিশ্চিতভাবে ও স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতাম। ওই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে এবং তা পুরোপুরি অসত্য।”
বিবৃতিতে বলা হয়, ইউএই এখন ইরানের প্রতিপক্ষদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসনের জন্য একটি উৎক্ষেপণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
খাতাম আল-আম্বিয়া ঘাঁটির মুখপাত্র বলেন, “দুঃখজনকভাবে, আজ ইউএই আমেরিকা ও ইহুদিবাদী তথা জায়নিস্টদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে—যারা ইসলামি বিশ্বের শত্রু এবং অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ।” তিনি যোগ করেন, দেশটি এখন তাদের সামরিক বাহিনী ও সাজ-সরঞ্জামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিবৃতিতে আমিরাতের নেতাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ‘ইসরায়েল’-এর সঙ্গে তাদের সমন্বয় পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়।
“আপনার দেশ আমেরিকান ও জায়নিস্ট এবং তাদের সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জামের জন্য আশ্রয়স্থল হওয়া উচিত নয়, যা ইসলামি বিশ্ব ও মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। নিজেদের তাদের ফাঁদে ফেলবেন না।”
এতে সমন্বিত প্রচার অভিযানেরও নিন্দা জানানো হয় এবং আবুধাবির বিরুদ্ধে “কাপুরুষোচিত মিডিয়া আক্রমণ, মিথ্যা অভিযোগ এবং নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন” করার অভিযোগ আনা হয়।
মুখপাত্র আরও বলেন, ইরানের এতদিনের সংযম ছিল কৌশলগত।
তিনি বলেন, “আপনাদের প্রচারণা এবং ইসলামি জাতি ও ইরানের শত্রুদের সহায়তার মুখে আমরা এখন পর্যন্ত যে সংযম দেখিয়েছি, তা কেবল নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সেই দেশের আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের কথা বিবেচনা করেই।” তবে তিনি সতর্ক করে দেন, এই সংযমেরও সীমা আছে।
এই বিবৃতি প্রকাশের কিছুক্ষণ পর প্রেস টিভি জানায়, ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন একটি ব্যবস্থা চালু করেছে।
নতুন ব্যবস্থার অধীনে, প্রণালী অতিক্রম করতে ইচ্ছুক সব জাহাজকে info@PGSA.ir ঠিকানা থেকে একটি ইমেইল পাঠানো হবে, যেখানে যাতায়াতের নিয়মাবলি উল্লেখ থাকবে।
জাহাজগুলোকে এই কাঠামো অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম সমন্বয় করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের আগে অনুমতি নিতে হবে, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনী হরমুজ প্রণালী কঠোর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব জাহাজকে অবরুদ্ধ করেছে।
সম্প্রতি উত্তেজনা আরও বেড়েছে, যখন রবিবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙার লক্ষ্যে একটি অভিযান শুরু করে। ইরানি বাহিনী বারবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে এই কৌশলগত জলপথের কাছাকাছি না আসতে সতর্ক করেছে।
সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের তেল স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। ফুজাইরাহ কর্তৃপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে।
তবে একটি উচ্চপদস্থ সামরিক সূত্রের বরাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) জানায়, উল্লিখিত তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ইরানি বাহিনীর ছিল না।
সূত্রটি বলে, “যা ঘটেছে তা মূলত মার্কিন সেনাবাহিনীর দুঃসাহসিক পদক্ষেপের ফল, যার উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালীর নিষিদ্ধ জলপথ দিয়ে জাহাজের অবৈধ চলাচলের জন্য একটি করিডোর তৈরি করা।”
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দেশটির প্রতি বৈরী পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা বন্ধ করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের ওই মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানানোর সব অধিকার সংরক্ষণ করে। গতকাল মঙ্গলবার এক বার্তায় মন্ত্রণালয় জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অযৌক্তিক আগ্রাসনের সময় আবুধাবি তাদের ভূখণ্ডকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে দিয়েছে।
বার্তায় আমিরাতকে সতর্ক করে বলা হয়, “বৈরী পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড” অব্যাহত রাখবেন না।
বার্তায় আরও বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে সহযোগিতার পাশাপাশি, সংযুক্ত আরব আমিরাত তথা ইউএইতে প্রতিপক্ষদের ঘাঁটি ও সরঞ্জাম অব্যাহতভাবে আশ্রয় দেয়া “আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক পরিণতি বয়ে আনতে পারে।”
মন্ত্রণালয় আমিরাতের শাসকদের নিন্দা জানিয়ে আরও বলেছে, এই শাসকরা ইরানের বিরুদ্ধে ওই আরব দেশটিকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তুলেছে অথচ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে কেবল আমিরাতের ভেতরে থাকা বৈরী লক্ষ্যবস্তুকেই লক্ষ্য করে।
এই অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে বার্তায় আরও বলা হয়, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করেছে, দায়িত্বশীল পন্থা অবলম্বন করেছে এবং অঞ্চল ও মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিত স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেছে।”
তবে মন্ত্রণালয় উপসংহারে জানায়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র “নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত যে কোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।”
ইউএই এবং বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানসহ আরও অনেক আঞ্চলিক দেশ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলা অযৌক্তিক আগ্রাসনের সময় তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের ওপর হামলার জন্য উৎক্ষেপণস্থল হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়।
এর জবাবে ইরান পুরো অঞ্চলে আমেরিকান ও ইসরায়েলি সংবেদনশীল ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে অন্তত ১০০ দফা বেশ বিধ্বংসী ও সফল পাল্টা আঘাত হানে।
এই পাল্টা হামলায় অন্যান্য কিছুর পাশাপাশি এসব দেশে থাকা আমেরিকান স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করা হয়, যেগুলো আগ্রাসন সক্ষম করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পার্সটুডে



























