বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের চিত্র দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ অতিদারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে দারিদ্র্যবিষয়ক গবেষণা সংস্থা জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন (জেআরএফ)। খবরটি জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের হার সবচেয়ে বেশি। হিসাব অনুযায়ী, ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারের ৫৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানি পরিবারের ৪৯ শতাংশ অতিদরিদ্র শ্রেণির মধ্যে পড়ে। এই পরিসংখ্যান দেশটির জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতা তুলে ধরে।
জেআরএফের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ব্রিটেনে ‘অতিদরিদ্র’ বলতে বোঝায় এমন পরিবারকে, যাদের বাড়িভাড়া পরিশোধের পর অবশিষ্ট আয় জাতীয় গড় আয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই সন্তানসহ কোনো পরিবারের বার্ষিক আয় যদি ১৬ হাজার ৪০০ পাউন্ডের নিচে হয়, তবে সেই পরিবারকে অতিদরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। এর অর্থ হলো, ব্রিটেনে বসবাসরত বেশির ভাগ বাংলাদেশি পরিবারের আয় জাতীয় গড় আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশেরও কম।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে। যেখানে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ শতাংশ, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে অতিদরিদ্রের ক্ষেত্রে। এই হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ইঙ্গিত দেয়—দারিদ্র্যের গভীরে তলিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে। গত তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দরিদ্র শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুতর সামাজিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নীতিগত দিক থেকেও প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, কম আয়ের পরিবারে দুই সন্তানের বেশি হলে তারা আর সরকারি সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা পাবে না। তবে চলতি বছরের এপ্রিলে এই নিয়ম বাতিল করেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস।
জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে স্বাগত জানিয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই পদক্ষেপ একাই শিশু দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তাদের মতে, দারিদ্র্যের সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশুরা এবং এরপর রয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের কিছু জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। বিশেষ করে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অর্ধেকেরও বেশি পরিবার (৫৩ শতাংশ) এবং পাকিস্তানিদের প্রায় অর্ধেক পরিবার (৪৯ শতাংশ) দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল। এসব পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের হার আরও ভয়াবহ—বাংলাদেশি শিশুদের ৬৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানি শিশুদের ৬০ শতাংশ এই সংকটে আক্রান্ত।
দারিদ্র্যবিরোধী সংগঠন বিগ ইস্যু–এর প্রতিষ্ঠাতা জন বার্ড এই প্রতিবেদনকে “সমাজের জন্য একটি বড় দুঃসংবাদ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই পরিসংখ্যান যুক্তরাজ্যের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীর চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। তথ্যসূত্র : রয়টার্স



























