সূরা জুমুআ’র দ্বিতীয় আয়াতটি রাসূলুল্লাহর (সা.) বে’সাত সম্পর্কিত। এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা উম্মীগণের (নিরক্ষর ও অশিক্ষিতদের) মধ্য থেকে একজন রাসূলকে মনোনীত ও নির্বাচিত করেছেন; যাতে তিনি তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা, প্রশিক্ষণ, সংশোধন ও পরিশুদ্ধি দানের পাশাপাশি তাদের সম্মুখে আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করতে পারেন (এ ধারা শুধুমাত্র তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা অব্যাহত থাকবে)। যেহেতু আলোচ্য আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ বর্তমান ও ভবিষ্যত ক্রিয়াবাচক, সেহেতু এ বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, ইসলাম ধর্ম কোন বিশেষ যুগ ও প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এ ধর্ম অব্যাহত থাকবে। কবে নাগাদ তা অব্যাহত ও চলমান থাকবে? এ বিষয়টিও স্পষ্ট ও সীমাবদ্ধ করা হয় নি; অর্থাৎ তা অনন্তকাল অবধি বহাল ও কার্যকর থাকবে।
পূর্ববর্তী আয়াতটি (الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ তিনি রাজাধিপতি, পরম পবিত্র, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” ) আলোচ্য আয়াতের বর্ণনাকে যেমনভাবে সুস্পষ্ট করে, তেমনভাবে ভূমিকা স্বরূপও। অর্থাৎ যেহেতু মহান আল্লাহ এ বিশ্বজগতের রাজাধিপতি, প্রতিপালক ও মহা পরাক্রমশালী শাসক, সেহেতু তিনিই মানবজাতির জীবনধারা ও ধর্মের নির্দেশ দাতা, তিনিই মানুষের সফলতা ও নাযাতের পথদ্রষ্টা এবং তিনিই মানুষকে হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার জন্য নবি-রাসূল প্রেরণ করেন। কেননা তিনিই তো মানুষের পৃষ্ঠপোষক এবং তিনিই তো মানুষের উপর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নবি-রাসূল মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরিত হবে, তা নিশ্চিতভাবে মানুষের জন্য অতিশয় কল্যাণকর হবে। কেননা তিনি আল্লাহর ইল্ম (প্রজ্ঞা) এবং কুদরত (শক্তি ও ক্ষমতা) থেকে উৎসারিত; সে কোন অবস্থাতে অক্ষম, দুর্বল ও অজ্ঞ নন।
আল্লাহর প্রেরিত দূত কিংবা রাসূল সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধিদের মোকাবেলায় চূড়ান্ত বিজয়ের অধিকারী। কেননা আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, তিনি এমনই বিজয়ী সত্তা পরাজয় যাকে কখনও স্পর্শ করতে পারে না। তিনি সব কিছুর উপর কর্তৃত্বশীল কিন্তু কোন কিছুই তার উপর কর্তৃত্বশীল নয়। সুতরাং যা কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয় এবং তিনি অজ্ঞ ও মূর্খ সম্প্রদায়ের হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার নিমিত্তে নবুয়ত ও রেসালতের গুরুদায়িত্ব দিয়ে যাদেরকে প্রেরণ করেন; সেগুলো সবই মানবজাতির জন্য মহা কল্যাণকর এবং এতে মানুষের জন্য বিন্দুমাত্র ক্ষতি ও অনিষ্টের কোন সম্ভাবনা নেই। এমনকি সমগ্র সৃষ্টিজগতই তা থেকে উপকৃত হবে। কারণ আল্লাহ তো প্রজ্ঞাময়; তিনি যা কিছু সম্পন্ন করেন তা সব ধরনের ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে এবং কল্যাণময়। আল্লাহর পবিত্র নামসমূহ তার মহিমান্বিত বৈশিষ্ট্যাবলির প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে; পরবর্তী আলোচনায় আমরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরব।
অশিক্ষিত ও মূর্খদের মাঝে রাসূলের (সা.) রেসালতের গুরুদায়িত্ব
এখন আমরা সূরা জুমুআ’র দ্বিতীয় আয়াতের প্রথমাংশের প্রতি আলোকপাত করব; আয়াতের এ অংশে উল্লেখ করা হয়েছে,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ
“তিনি (আল্লাহ) উম্মীদের (মূর্খদের) মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে উত্থিত (প্রেরণ) করেছেন।” যদি আমরা এ আয়াতে ব্যবহৃত শব্দগুলোর প্রতি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে- بَعَثَ শব্দের অর্থ হচ্ছে উত্থিত করা (প্রেরণ করা), فِي الْأُمِّيِّينَ শব্দদ্বয়ের অর্থ হচ্ছে উম্মী তথা মূর্খ ও অশিক্ষিতদের মধ্যে, رَسُولًا অর্থ রাসূলরূপে এবং مِّنْهُمْ অর্থ তাদের মধ্য থেকে।
এখানে بَعَثَ শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে উত্থিত করা, আন্দোলিত করা কিংবা প্রেরণ করা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঘুমিয়ে আছে, তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা কিংবা হঠাৎ করে জাগ্রত করা। উদাহরণস্বরূপ কেউ ঘুমিয়ে আছে, হঠাৎ যদি সে জাগ্রত হয় এবং বিছানা থেকে দাঁড়িয়ে যায়; তাহলে আভিধানিক দিক থেকে এমন উত্থিত হওয়াকে বলে بَعَثَ ‘বাআসা’। পবিত্র কুরআনে কিয়ামতের দিনকে يَوْمُ الْبَعْثِ ‘ইয়াওমুল বা’স’ তথা উত্থিত হওয়ার দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ দিন আল্লাহর নির্দেশে মৃত ব্যক্তিরা কবরসমূহ হতে উত্থিত হবে। এখানে ধীর স্থিরভাবে উত্থিত হওয়াকে বুঝায় নি; বরং এ দিন আকস্মিকভাবে তাদেরকে কবর হতে উত্থিত করা হবে। রাসূলুল্লাহও (সা.) নিজের মধ্যে এমন আকস্মিক স্পন্দন ও জাগ্রত অবস্থা অনুভব করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) রেসালতের গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে এক সাধারণ জীবনযাপন করতেন; যেমনভাবে অন্য সবাই করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে মূখ্য পার্থক্য হচ্ছে তদানীন্তন সমাজে বিদ্যমান লোকদের ন্যায় মূর্খতা, শিরক, কুফর কিংবা অনৈতিক কোন বিষয় রাসূলকে (সা.) আদৌ স্পর্শ করতে পারে নি। অবশ্য তিনি তখন রাসূল হিসেবেও অভিষিক্ত হন নি। আল্লাহর ঘোষিত রাসূল হিসেবে মানুষের হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার যে গুরুদায়িত্ব রয়েছে, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তা তাঁর উপর অর্পিত হয় নি। বরং তখনও তিনি একজন সাধারণ ব্যক্তি হিসেবেই সমাজে পরিচিত ছিলেন। পবিত্র কুরআনে রাসূলের (সা.) শৈশব ও কৈশোরের প্রতি ইশারা করে বলা হয়েছে,
أَلَمْ يَجِدْكَ يَتِيمًا فَآوَى وَوَجَدَكَ ضَالًّا فَهَدَى
“তিনি কি তোমাকে পিতৃহীন রূপে পেয়ে তোমাকে আশ্রয় দান করেন নি? তিনি তোমাকে (মানুষের মধ্যে) বিস্মৃত পেলেন, অতঃপর পথনির্দেশ করলেন।” এ আয়াতে ضَالًّا শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যেটির শাব্দিক অর্থ হচ্ছে পথহারা। কিন্তু শব্দের এ অর্থটি কোন অবস্থাতে রাসূলের (সা.) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; কেননা তিনি কখনও অন্যদের ন্যায় পথহারা কিংবা বিভ্রান্ত হতে পারেন না। কারণ যদি এ শব্দটি নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয় তবে তা রাসূলের (সা.) মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বের সাথে কোনরূপ সামঞ্জস্যতা রাখে না। যেহেতু আরবী ভাষায় একটি শব্দের কয়েকটি সমার্থক কিংবা রূপক অর্থের প্রচলন রয়েছে, সেহেতু এখানে ضَالًّا বলতে বিম্মৃত কিংবা অজ্ঞাত অর্থকে বুঝান হয়েছে। কেননা তখনও তো তিনি রেসালতের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞাত হন নি।
এ পথ সম্পর্কে তিনি অজ্ঞাত ছিলেন। কেননা তখনও নবুয়ত ও রেসালতের সম্পূর্ণ রোডম্যাপ তাঁর নিকট অর্পিত হয় নি। রেসালতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে তিনি বে’সাতের সামগ্রিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল অবতীর্ণ হন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম প্রত্যাদেশ সম্পর্কে রাসূলকে (সা.) অবহিত করেন-
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
“পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি (সকল কিছু) সৃষ্টি করেছেন।” এ আয়াত নাযিলের মাধ্যমে রাসূলের (সা.) বে’সাত তথা রেসালতের গুরুদায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হয়। তখন থেকে জিবরাঈল (আ.) রাসূলকে (সা.) পর্যায়ক্রমে ঐশী নির্দেশনা সম্পর্কে অবহিত করেন। ফলে রাসূলও (সা.) এ বিষয়ে ধীরে ধীরে স্বীয় লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এমনকি এ অগ্রসর হওয়ার ধারা তাঁর ওফাতের পূর্ব পর্যন্ত প্রতিনিয়ত সম্মুখ গতিতে চলমান ছিল। কখনও তা স্তিমিত হয় নি। বস্তুত আল্লাহর সৎ ও নেক বান্দারা বিশেষত ওলী-আওলিয়া এবং তাদের মধ্যমণি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা.) বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা কখনও ঐশী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য প্রদর্শন করেন না। তারা প্রতি মুহূর্তে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার দিকে এগিয়ে যান।
সুতরাং মহানবি (সা.) বে’সাতের গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই প্রতি মুহূর্তে পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু বে’সাত লাভের পূর্বেও তিনি যাবতীয় মহিমান্বিত গুণাবলিতে সমৃদ্ধ ছিলেন; তিনি ছিলেন মহানুভব, সাহসী, সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী, সৎ ও বিশ্বস্ত। তিনি কখনও মন্দ ও অন্যায় কর্মে লিপ্ত হন নি এবং কারও প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার করেন নি। পবিত্রতা, সততা এবং তাকওয়া অবলম্বনের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করেছেন; সমাজের লোকেরা তাঁকে অনুপম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলির অধিকারী হিসেবেই চিনতো। সেসময়ও তাঁর জীবন ছিল পরিশুদ্ধ, পুত-পবিত্র, অতুলনীয়, মহিমান্বিত ও বরকতময়। মোটকথা সকল মানবীয় ও স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্যাবলির ভাণ্ডার ছিলেন তিনি ; কিন্তু তদুপরি বে’সাতের পূর্বে তিনি মানুষকে হেদায়েতের পদ্ধতি ও চূড়ান্ত কল্যাণের পথ নির্দেশনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন না। আর এ পথটি ছিল ইসলাম ও কুরআনের; হযরত জিবরাঈল (আ.) ওহীর মাধ্যমে সে পথের সন্ধান তাঁকে দেন। যা ছিল বে’সাত। সুতরাং রাসূল (সা.) বে’সাতের পূর্বে অতুলনীয় মানবিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও এক সাধারণ জীবনযাপন করতেন, কিন্তু হঠাৎ এক ঐশী আওয়াজ তাকে জাগ্রত ও আন্দোলিত করে সম্পূর্ণ নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করায়। আর এ অবস্থার নামই হচ্ছে বে’সাত তথা রেসালতের গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া।
কাজেই আল্লাহ তায়ালা এ পবিত্র মানবকে বে’সাতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেন, তাঁকে মনোনীত ও উত্থিত করেন। আকস্মিকভাবে তাঁকে সামগ্রিকভাবে জাগ্রত করেন; তাঁর প্রাণ, আত্মা, শরীর এবং চিন্তা-চেতনা সব কিছুকেই প্রবলভাবে আন্দোলিত করেন। কিন্তু কাদের মধ্যে এ গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ তাঁকে অধিষ্ঠিত করেন? এ প্রশ্নের উত্তরই আমাদের আলোচ্য বিষয়। এটা এক অলৌকিক বিষয় ও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ তাদের প্রতি যাদের মধ্যে মহানবিকে (সা.) নবুয়ত ও রেসালতের দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি প্রেরণ করেছেন। তাই আয়াতটিতে একরূপ করুণা প্রদর্শনের ইঙ্গিত রয়েছে। রাসূলুল্লাহর (সা.) বে’সাতের বিষয়টি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ এক করুণা তা কুরআনের অন্য এক আয়াতে আল্লাহ এভাবে উল্লেখ করেছেন,
لَقَدْ مَنَّ اللّهُ عَلَى الْمُؤمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْ أَنفُسِهِمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মু’মিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের জন্য তাদের নিজেদের (জাতির) মধ্য থেকেই এক রাসূল প্রেরণ করেছেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৬৪) যদিও সূরা জুমুআ’র দ্বিতীয় আয়াতে অনুগ্রহ শব্দটি বর্ণিত হয় নি; কিন্তু বাস্তবে এ সূরার আয়াতটিতেও রাসূলের (সা.) রেসালত যে মানবজাতির প্রতি আল্লাহর এক করুণা তার প্রতি প্রচ্ছন্ন এক ইঙ্গিত রয়েছে। এখানেও মূর্খ ও অশিক্ষিতদের মধ্যে তাঁকে প্রেরণের বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ তাদের প্রতি যে করুণা করেছেন তাদের তা বোঝাতে চেয়েছেন। বস্তুত এমনই এক সমাজে রাসূলকে (সা.) উত্থিত করা হয়, যে সমাজের লোকেরা ছিল মূর্খ, অজ্ঞ, অশিক্ষিত এবং সে সমাজ ছিল ভদ্রতা, সংস্কৃতি ও নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত নানাবিধ কুসংস্কারে জর্জরিত। তারা ছিল নিজেদের চরম মূর্খতা ও ভ্রান্ত প্রথাসমূহে নিমজ্জিত একটি আবদ্ধ সমাজ।
আরবি ভাষাতে ‘উম্মী’ শব্দটি মূর্খ ও অশিক্ষিত অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার এ শব্দটি সংস্কৃতি বিবর্জিত অর্থেও ব্যবহৃত হয়। হয়তো মূর্খ ও অশিক্ষিত এবং সংস্কৃতি বিবর্জিত উভয় অর্থেই ‘উম্মী’ শব্দটি প্রয়োগ হয়ে থাকে। আমরা যদি ‘উম্মী’ শব্দের যথাযথ ব্যাখ্যা উদ্ঘাটন করি, তবে দেখা যাবে এ শব্দের অর্থ হচ্ছে সহজাত কিংবা জন্মগত স্বভাবের অধিকারী। একটি সহজাত কিংবা জন্মগত স্বভাবের লোক অথবা সমাজ বলতে কি বুঝায়? অর্থাৎ একটি সমাজে প্রচলিত সংস্কৃতির মধ্যে জন্মলাভ করা এবং সে সমাজে বিদ্যমান প্রথাসমূহের মধ্যে বেড়ে ওঠা। এ সমাজের বাইরে থেকে কিছু গ্রহণ না করা। এমনকি অন্য কোন সমাজ থেকে কোন ধর্ম কিংবা মতাদর্শ গ্রহণ করে নি। তদানীন্তন সময়ে খ্রিস্ট ধর্ম সারা বিশ্বে বিরাজমান ছিল, এমনকি আরব ভূ-খণ্ডের নিকটবর্তী হাবাশা (ইথিওপিয়া) রাষ্ট্রে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচলন ছিল; কিন্তু তদুপরি এ ধর্ম থেকে তারা ছিল অনেক দূরে। অনুরূপভাবে ইহুদি ধর্ম থেকেও তারা কিছু গ্রহণ করে নি। বরং তারা তাদের পৌত্তলিক পূর্বপুরুষদের অনুসৃত পন্থা তথা মূর্তিপূজার ন্যায় মনগড়া মতাদর্শে আবদ্ধ ছিল। সুতরাং তদানীন্তন আরবসমাজ ছিল সহজাত ও জন্মগত স্বভাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত উৎকর্ষতা লাভের সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত স্থবির এক সমাজ।
অবশ্য এক্ষেত্রে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, মানুষ সাধারণত জন্মগতভাবে যেমন নিরক্ষর তেমনি সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিবর্জিত। কিন্তু নির্বোধ ও মেধাশুন্য নয়। আমরা যখন বলি একটি ‘উম্মী সমাজ’; এর অর্থ আদৌ এমনটি নয় যে, তারা সবাই অনুভূতিহীন ও বোধশুন্য। বরং এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভৌগলিক অঞ্চলে বেড়ে ওঠা লোকেরাও প্রতিভাবান ও তুখোড় মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
হ্যাঁ, বাস্তবে এমনটিই ঘটেছিল। তারা যেমন অত্যন্ত প্রতিভাবান তেমনি সম্ভাবনাময় মেধাসম্পন্ন ছিল। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা, বদ্ধ পরিবেশ এবং গোঁড়ামি মানসিকতার কারণে তারা অন্য কারও নিকট থেকে কোনকিছু শিক্ষা লাভ করা থেকে বঞ্চিত ছিল।
যদি হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তৎকালীন আরব সমাজে জন্মলাভ এবং সেখানে নবুয়ত ও রেসালতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত না হতেন, তাহলে হয়তো তারা আজীবন কাফির হিসেবে বহাল থাকত। কেননা তারা স্বগোত্রীয় ব্যতীত অন্য কারও নিকট থেকে কিছু গ্রহণ করত না। সুতরাং এ সমাজের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ছিল যে, তিনি তাদের মধ্য থেকে রাসূলকে (সা.) মনোনীত এবং বে’সাতের গুরুদায়িত্বে অধিষ্ঠিত করেন; যাতে তারা তাঁর নিকট থেকে দীক্ষা গ্রহণ করে। তারা তাঁর সাহচর্যে এসে আলোকিত ও উদ্ভাসিত হয়। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে সে সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিরা নিজেদের দাম্ভিকতা ও গোঁড়ামি মনোভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে। কিন্তু পরিশেষে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় এবং তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়। কাজেই ‘উম্মী সমাজ’ বলতে এমন অবস্থাকেই বুঝান হয়েছে।
লোকদের মধ্য থেকে রাসূলকে (সা.) উত্থিত (প্রেরণ) করা
পবিত্র কুরআনের ভাষায়,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ
“তিনি (আল্লাহ) উম্মীদের (মূর্খদের) মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে উত্থিত (প্রেরণ) করেছেন।” এ আয়াতে ‘তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূলরূপে উত্থিত (প্রেরণ) করা’ বলতে কি বুঝান হয়েছে? তিনি কি তাদের ন্যায় মূর্খ ও অশিক্ষিত ছিলেন? তিনিও কি তাদের মত রুক্ষ মেজাজের ছিলেন? তাদের ন্যায় নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যাবলির অধিকারী ছিলেন? না, কখনই না। বরং ‘তাদেরই মধ্য থেকে’ বলতে ‘তাদের জাতি থেকে’ কিংবা ‘তাদের সম্প্রদায় থেকে’ এবং ‘তিনি সে সমাজের বাইরে থেকে আসেন নি’ এ বিষয়গুলোই বুঝান হয়েছে। একশ্রেণীর লোক এ আয়াতের মর্মার্থ অনুধাবন না করেই ব্যাখ্যা করার অপপ্রয়াস চালায় যে, রাসূল (সা.) মূর্খ ছিলেন। এটা সত্য যে, যদি কেউ শিক্ষা গ্রহণ না করে, তবে সে অশিক্ষিত; যদি কেউ কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে ধারণা লাভ না করে, তবে সে সংস্কৃতিহীন। কিন্তু এখানে মূখ্য বিষয় হচ্ছে- রাসূল (সা.) সে সমাজের কারও নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন নি; বরং তিনি সকল জ্ঞানের উৎস মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশী দীক্ষা লাভ করেছেন। যেমনভাবে যদি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হযরত আদমকে (আ.) ঐশী জ্ঞানে সমৃদ্ধ না করতেন, তবে তিনি অজ্ঞ অবস্থাতে থাকতেন। অন্যান্য নবি-রাসূলদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বহাল ছিল। সুতরাং এ আয়াতটি আদৌ এটা প্রমাণ করে না যে, যেহেতু রাসূল (সা.) ‘উম্মী সমাজ’ থেকে উত্থিত হয়েছেন, সেহেতু তিনিও তাদের ন্যায় ঐ অর্থে উম্মী।
প্রকৃতপক্ষে এ আয়াতে বর্ণিত مِّنْهُمْ বাক্যটি ‘তাদের মধ্য থেকে’ কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৬৪ নং আয়াতে বর্ণিত مِّنْ أَنفُسِهِمْ বাক্যের ‘তাদের নিজেদের (স্বজাতির মধ্য) থেকে’ অনুরূপ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। উভয় আয়াতেই অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশের কথা বর্ণনার পাশাপাশি অনুরূপ অর্থও প্রকাশ করা হয়েছে। সুতরাং এখানে তাদের সমাজ থেকে, তাদের সম্প্রদায় থেকে, তাদের নিজেদের মধ্য থেকে, কিংবা তাদের গোত্র থেকে প্রভৃতিকে বুঝান হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের ন্যায় মূর্খ কিংবা তাদের ন্যায় অশিক্ষিত এমন কিছু আদৌ বুঝান হয় নি। তিনি তাদের মধ্য থেকে উত্থিত হয়েছেন, যাতে আল্লাহর আয়তসমূহকে তাদের সম্মুখে পাঠ করতে পারেন; যা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত হিসেবে গণ্য। আল্লাহর আয়াত কোথায় এবং তারা কোথায়; তারা কি রাসূলের (সা.) বে’সাতের পূর্বে আদৌ কুরআনের আয়াত শুনেছিল? স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে (সা.) তাদের মধ্য থেকে মনোনীত করেছেন, যাতে তিনি তাদের সম্মুখে আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করেন এবং তাদেরকে সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা, দাম্ভিকতা, সত্য গ্রহণে অনিচ্ছা ও গোঁড়ামি মানসিকতা থেকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন।
প্রশিক্ষণের পূর্বে পরিশুদ্ধি
এ আয়াতে প্রথমে আল্লাহ يُزَكِّيهِمْ তথা ‘তাদেরকে পরিশুদ্ধ’ করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, তারপর يُعَلِّمُهُمُ তথা ‘তাদেরকে শিক্ষা দানের’ বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে তাদেরকে শিরক, অনাচার, কলুষতা, সত্য গ্রহণে অনিচ্ছা ও গোঁড়ামি মানসিকতার ন্যায় নেতিবাচক দিকগুলো থেকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের মন ও অন্তরকে প্রস্তুতকরণের পর শিক্ষাদানের কার্যক্রম শুরু করেন। কাজেই শিক্ষার পূর্বে পরিশুদ্ধি অর্জন জরুরী ও অপরিহার্য। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরিশুদ্ধি ছাড়া শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব নয়। অবশ্য এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াতে শিক্ষা ও পরিশুদ্ধি একই সাথে বর্ণিত হয়েছে। কোথাও পরিশুদ্ধি প্রথমে এসেছে; যেমন আলোচ্য আয়াতে (সূরা জুমুআ’র ২ নং আয়াত)। আবার কোথাও শিক্ষাদানের বিষয় প্রথমে বর্ণিত হয়েছে; যেমন সূরা বাকারাতে হযরত ইবরাহীম (আ.) এভাবে প্রার্থনা করেছেন,
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ
“হে আমার প্রতিপালক! আর তাদের মধ্য থেকে তাদের জন্য এক রাসূল আবির্ভূত (ও উত্থিত) কর যে তাদের সম্মুখে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করবে, তাদেরকে ঐশীগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা (বিবেকের কথা) শিক্ষা দেবে এবং তাদের পরিশুদ্ধ করবে।” এ আয়াতে কিতাব তথা ঐশীগ্রন্থের শিক্ষা পরিশুদ্ধির পূর্বে এসেছে।
সুতরাং কোথাও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বিষয় আগে এসেছে, আবার কোথাও পরিশুদ্ধির বিষয় প্রথমে বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করা জরুরী যে, যেখানে সরাসরি আল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, সেখানে সর্বদা পরিশুদ্ধি প্রথমে এসেছে। কিন্তু যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও মুখ থেকে [যেমন হযরত ইবরাহীমে (আ.) ভাষায়] উচ্চারিত হয়েছে, সেখানে সাধারণত শিক্ষাদানের কথা আগে বলা হয়েছে। অতএব আমরা এমন ফলাফলে উপনীত হতে পারি যে, মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে পরিশুদ্ধির বিষয়টি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পূর্বে জরুরী। অর্থাৎ প্রথমে মানুষকে একটা পর্যায় পর্যন্ত পরিশুদ্ধি অর্জন করতে হবে, তারপর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে রত হওয়া প্রয়োজন।
সম্মানীত ভ্রাতা ও ভগ্নীগণ! আমরা যদি পরিশুদ্ধি অর্জন না করি, তবে আমরা কিছু শিখতে পারব না। আমরা যদি বাস্তবতার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাব যে, অনেক বিষয় রয়েছে আল্লাহর নেক বান্দারা খুব সহজে তা অনুধাবন ও গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু অন্যরা সহজে তা অনুধাবন করতে পারে না ও তাদের জন্য ঐরূপ বিষয় বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন। কাজেই এক্ষেত্রে আমার মতে প্রত্যেক মানুষের উচিত আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংশোধনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহন করা; বিশেষ করে আপনারা তরুণরা নৈতিক পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে সর্বদা সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন। আমি আমার ধারাবাহিক তাফসির আলোচনাতে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলি ও নৈতিক পরিশুদ্ধি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি। দম্ভ, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মকেন্দ্রিকতা, সংকীর্ণতা ও গোড়ামি মানসিকতাসহ নানাবিধ নৈতিকতার পরিপন্থী বিষয়াদি আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায়। কাজেই এসব নেতিবাচক গুণাবলি থেকে নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করা জরুরী; যাতে ঐশী দীক্ষা অনুধাবন ও রপ্ত করা সম্ভব হয়। সুতরাং প্রশিক্ষণের পূর্বে আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন।



























