ইরাকের নাজাফ আশরাফে হযরত আমিরুল মুমিনিন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর পবিত্র মাজারে অবস্থিত সোনালী ইভান ( বারান্দা ) বিশ্বের ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম গৌরবময় নিদর্শন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই স্থাপনা মুসলমানদের, বিশেষ করে আহলে বাইতের অনুসারীদের প্রথম ইমামের প্রতি ভালোবাসা, ভক্তি ও গভীর বিশ্বাসের উজ্জ্বল প্রতিফলন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
বার্তাসংস্থা ইকনা জানিয়েছে, “ সোনালী ইভান ” বা আরবিতে “আল-ইওয়ান আল-জাহাবি” নাজাফ শরিফের পবিত্র রওজার মূল প্রাঙ্গণ ও প্রধান ইওয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা হযরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজারের পূর্ব দিকে অবস্থিত।
নাজাফের ইভান নির্মাণের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক নিদর্শন হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে গিয়ে পৌঁছায়। ইলখানী শাসনামলে, ইভানে সংরক্ষিত শিলালিপির ভিত্তিতে জানা যায় যে, প্রথম বড় ধরনের সংস্কার কাজ হয় উলজাইতু খানের শাসনামলে (প্রায় ৭০৩ হিজরি / ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দ)। সে সময় মাজারের প্রবেশপথ ফিরোজা রঙের টাইলসে সজ্জিত ছিল।

পবিত্র মাজারের প্রাঙ্গণ এবং নাজাফের ইভান (বারান্দা) নির্মাণের সূচনা হয় ১০৩৮ হিজরিতে, শাহ আব্বাস সাফাভি এবং শেখ বাহাইয়ের শাসনামলে। শেখ বাহাই, যিনি তাঁর সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান এবং তৎকালীন সকল শিল্প ও বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন, বারান্দার দুটি মিনার এমনভাবে ডিজাইন করেছিলেন যে, ভূমি থেকে আজান কক্ষ পর্যন্ত সিঁড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৩টি—যা হযরত আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর বয়স মুবারকের প্রতীক।
তবে মাজারটির এই সোনালী ইভানের অবস্থান অন্যান্য ইভানের তুলনায় ভিন্ন। সাধারণত ইমামদের মাজারে বড় ইভান কিবলার দিকে নির্মিত হয়; কিন্তু শেখ বাহাই এই অনন্য ও মহিমান্বিত স্থাপনার প্রধান ইভানটি হযরত আলী (আ.)-এর পবিত্র পদদেশের দিকে স্থাপন করেন।
ইভানের স্বর্ণায়ন
পবিত্র মাজার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ আবদুলহাদি ইব্রাহিমি বলেন, এটা সর্বজনবিদিত যে সাফাভি সম্রাট শাহ আব্বাস প্রথম ১০২৩ হিজরি / ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান স্থাপনাটি নির্মাণের সময় গম্বুজ, ইভান ও দুই মিনার মিনা-কারুকার্যযুক্ত টাইলসে সজ্জিত করেন।
প্রকৃতপক্ষে, ইভানের সোনালী আবরণ সাফাভি যুগ থেকেই শুরু হয়। মাজারের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দলিল ও আল্লামা মজলিসির রচিত তুহফাতুজ জায়ের গ্রন্থসহ বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, মূল স্বর্ণালঙ্করণ সম্পন্ন হয় ১০৫৮ হিজরি / ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে শাহ সাফাভির শাসনামলে। এ পর্যায়ে পাতলা স্বর্ণপত্র ইট ও প্লাস্টারের ওপর স্থাপন করা হয়।
সাফাভি যুগের পর কাজার শাসনামলে (হিজরি ১৩শ / খ্রিস্টীয় ১৯শ শতাব্দী) ইভানটি পুনরায় ব্যাপক সংস্কারের মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষ করে নাসিরুদ্দিন শাহ কাজারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই কাজ সম্পন্ন হয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১২৮০ হিজরির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ইভানের পুনরায় স্বর্ণায়নের জন্য ২০ হাজার শেকেলেরও বেশি স্বর্ণ ক্রয় করে নাজাফে পাঠানো হয়।

সাফাভি রাজবংশের পতনের পর নাদির শাহ আফসার ক্ষমতায় এলে, মাজারের পুরোনো পাথর সরিয়ে তামার পাত বসানো হয়, যা খাঁটি সোনায় মোড়ানো ছিল, এবং জিয়ারতগাহের উপরিভাগ স্বর্ণে আচ্ছাদিত করা হয়। ১১৫৫ হিজরি / ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে মাজারের তাযহিব বা স্বর্ণালঙ্করণ কাজ শুরু হয়ে ১১৫৬ হিজরি / ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে শেষ হয়।
এই ঐতিহাসিক তথ্যাবলি আজও মাজারের বিভিন্ন স্থাপত্য অংশে—বিশেষ করে সোনালী ইভানের খোদাই, নকশা ও অলংকরণে—দৃশ্যমান। এমনকি ইভানের বিপরীত পাশে, উপরের অংশে আরবি ভাষায় সুলুস লিপিতে লেখা একটি শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে যে, ১১৫৬ হিজরিতে নাদির শাহ মাজারটির স্বর্ণালঙ্করণের জন্য গৌরব অর্জন করেন।
বিংশ শতাব্দীর সংস্কার ও আধুনিকায়ন
পরবর্তী দশকগুলোতে, বিশেষ করে ইরাকে প্রথম এবং দ্বিতীয় ফয়সালের শাসনামলে (১৯২৫–১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ), স্থাপনাটিকে আরও মজবুত করতে বিভিন্ন সংস্কার কাজ করা হয়। এ সময় ইভানের উপরের অংশে পবিত্র কুরআনের আয়াতসম্বলিত ক্যালিগ্রাফিক অলংকরণ যুক্ত করা হয়।
১৩৮১ হিজরি / ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ভারত ও ইরানের আহলে বাইতের অনুসারীদের আর্থিক সহায়তায় ইভানের উপরের অংশে পুনরায় স্বর্ণালঙ্করণ সম্পন্ন হয়।
১৯৯০-এর দশকে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর—যখন ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হুসেইনের নেতৃত্বে বাহ্থ শাসনামলের সেনাবাহিনী কুয়েত আক্রমণ করে তখন যুদ্ধজনিত কম্পনের কারণে ইভানের কিছু ফাটল ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্ত সংস্কার করা হয়; তবে স্বর্ণ আবরণ অক্ষুণ্ন রাখা হয়। ইকনা



























