ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন আয়া সোফিয়া। প্রায় ষোলো শতক ধরে নানা শাসনব্যবস্থা, ধর্মীয় রূপান্তর ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই স্থাপনা। কখনো গির্জা, কখনো মসজিদ, আবার কখনো জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আয়া সোফিয়া আজও বিশ্ববাসীর কাছে তুরস্কের গৌরব ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
৫৩২ থেকে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের ক্ষমতাসীন শাসকের দরবার হিসেবে নির্মাণ করা হয় এই আয়া সোফিয়া। একাদশ শতাব্দীতে ক্যথলিক খ্রিস্টানরা দখল করে আয়া সোফিয়াকে গির্জায় রূপান্তর করে।
কালের ধারাবাহিকতায় ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে অটোম্যান সম্রাট ফাতেহ সুলতান কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করে আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপ দেন। এরপর দীর্ঘ সময় ৪৮১ বছর পরে ১৯৩৫ সালে তুরস্ক সরকার আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর হিসেব ঘোষণা করে। ৮৬ বছর পরে ২০২০ সালে আবারো মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় আয়া সোফিয়া।
মসজিদের ইমাম বিনিয়ামিন তুবজি উগলু জানিয়েছেন, ২০২০ সালের ২৪ জুলাই করোনা মহামারির সময় ঐতিহাসিক স্থাপনাটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। সেই দিন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের উপস্থিতিতে এখানে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এর পর থেকে প্রতিদিন এখানে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আয়া সোফিয়ার নির্দিষ্ট একটি অংশ মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফজর থেকে এশার নামাজ পর্যন্ত তা সব মুসল্লির জন্য উন্মুক্ত থাকে। বিশ্বের অন্যান্য মসজিদ পরিদর্শনের মতো এখানকার দর্শকদেরও শালীন পোশাক পরতে হয়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে মসজিদ কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের সহযোগিতা করে থাকে। ইমাম বিনিয়ামিন আরো জানান, ২০২১ সালে ১৩ লাখ লোক আয়া সোফিয়া পরিদর্শন করেন।
২০২২ সালে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল এক কোটি ৩৬ লাখ। আর ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬০ লাখ লোক তা পরিদর্শন করেন। অর্থাৎ ঐতিহাসিক এ স্থাপনার দর্শনার্থীসংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপ ও এশিয়ার সব দেশের পর্যটকদের কাছে তা খুবই জনপ্রিয়।
২০২২ ও ২০২৩ সালে আয়া সোফিয়া গ্র্যান্ড মসজিদ পরিদর্শনে ইন্দোনেশিয়ার দর্শনার্থীরা শীর্ষে রয়েছেন। কারণ তাদের অধিকাংশ হজযাত্রী সৌদি আরব যাওয়ার পথে ইস্তাম্বুলে বিরতি নেন এবং আয়া সোফিয়া দেখতে আসেন।
তিনি আরো জানান, উসমানীয় শাসনকাল থেকে আয়া সোফিয়ায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা চলে আসছে। এর মধ্যে শবেকদর, শবেমেরাজসহ ইসলাম গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা উল্লেখযোগ্য। তুরস্কের ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তর, ইস্তাম্বুলের দারুল ইফতা ও মসজিদের খতিব এবং ইমামদের সহযোগিতায় এসব রীতি পুনরায় চালু করা হচ্ছে। তা ছাড়া মসজিদ হওয়ার পর থেকে আয়া সোফিয়া প্রাঙ্গণে কোরআন, ফিকাহ, তাফসির, হাদিসবিষয়ক অসংখ্য দারস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিন বছরে এখানে ১২০ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মূলত তারা আয়া সোফিয়ায় এসে নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা দেন।
১৯৮৫ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয় ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়ায়। তুরস্কের পর্যটনবান্ধব স্থাপনাগুলোর মধ্যে স্থানটি অন্যতম। ২০২০ সালের ১০ জুলাই তুরস্কের আদালত ১৯৩৪ সালে মন্ত্রিসভা কর্তৃক আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর করার আদেশ বাতিল করে। ফলে দীর্ঘ ৮৬ বছর পর ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি মসজিদের ঐতিহ্যে ফেরার পথ সুগম হয়। এরপর ২০২০ সালের ২৪ জুলাই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের উপস্থিতিতে তাতে প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি



























