কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এমন কী গোপন আদেশ ছিল যা পালন করতে অস্বীকার করেছিলেন এই তুখোড় সমরনায়করা? যার কারণে রাতারাতি তাদের দীর্ঘদিনের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে হলো?
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ রদবদল অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরান সংকটের প্রেক্ষাপটে যে শীর্ষ জেনারেলদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো:
জেনারেল র্যান্ডি জর্জ (General Randy George): তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ (Army Chief of Staff) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি স্থল অভিযানের (Ground Invasion) পরিকল্পনায় অসম্মতি জানানোয় তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জেনারেল এরিক কুরিলা (General Michael “Erik” Kurilla): তিনি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর প্রধান ছিলেন, যার অধীনে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই অঞ্চলের যুদ্ধকৌশল নিয়ে প্রশাসনের সাথে মতভেদের কারণে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়
অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো (Admiral Samuel Paparo): তিনি ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের দায়িত্বে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে নৌ-শক্তির ব্যবহার নিয়ে নীতিগত পার্থক্যের কারণে তার নামও এই তালিকায় উঠে এসেছে।
রদবদলের কারণ ও প্রেক্ষাপট:
প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে যে, সামরিক কমান্ডে আরও বেশি ‘গতিশীলতা’ এবং ‘সমন্বয়’ আনার জন্য এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জেনারেলরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্ভাব্য ব্যয় এবং ক্ষয়ক্ষতি (Casualties) নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে, স্থলপথে ইরান আক্রমণ করলে তা ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।রাজনৈতিক আলোচনা
বর্তমানে এই জেনারেলদের স্থলে এমন কর্মকর্তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে যারা প্রশাসনের “অ্যাগ্রেসিভ” বা আক্রমণাত্মক সামরিক নীতির সাথে একমত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নজিরবিহীন ছাঁটাই মার্কিন সামরিক ইতিহাসে ‘কমান্ডারদের বিদ্রোহ’ বা ‘জেনারেলদের ছাঁটাই’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
রহস্যময় সেই ‘অস্বীকৃতি’ এবং জেনারেলদের বিদায়
বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছাঁটাই কোনো অযোগ্যতা বা কেলেঙ্কারির কারণে নয়। বরং এটি ছিল সরাসরি একটি ‘প্রতিরোধ’। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চস্তর থেকে একটি নির্দিষ্ট সামরিক পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছিল, যা যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই জেনারেলরা মেনে নিতে পারেননি। যখন ঝানু সমরনায়করা ‘না’ বলেন, তখন বুঝতে হবে সামনে ধেয়ে আসছে চরম কোনো বিপদ।
কেন এই বিদ্রোহ? ইরানে কি স্থল হামলার ছক?
এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে ইরান ইস্যু। এতদিন কেবল আকাশপথে হামলা বা নৌ-অবরোধের কথা শোনা গেলেও, এখন গুঞ্জন উঠেছে ইরানি ভূখণ্ডে সরাসরি ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ অর্থাৎ স্থল সেনা নামানোর পরিকল্পনা নিয়ে।
জেনারেলদের আপত্তির মূল জায়গাটি ছিল এখানেই। তারা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, ইরানে স্থল হামলা মানেই হবে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যর্থ যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি এড়াতেই কি তারা শেষ মুহূর্তে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন?
সতর্কবার্তা উপেক্ষা: ঝুঁকি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিজ্ঞ জেনারেলদের সরিয়ে দিয়ে দ্রুত এমন ব্যক্তিদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে যারা বর্তমান প্রশাসনের যুদ্ধংদেহী পরিকল্পনার সাথে একমত। এর অর্থ হলো, পরবর্তী বড় কোনো পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সামরিক পেশাদারদের সতর্কতা উপেক্ষা করে যখন রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধের শুরুতে এভাবেই অভিজ্ঞদের সতর্কবার্তা কানে তোলা হয়নি, যার মাশুল দিতে হয়েছিল কয়েক দশক ধরে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও মিত্রদের উদ্বেগ
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কেবল আমেরিকার বিষয় নয়। ন্যাটো (NATO) এবং ইউরোপীয় মিত্ররা এখন গভীর উদ্বেগের সাথে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যদি এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, তবে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্যে এমন ধস নামবে যা সামলানো কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
জেনারেলরা কি সঠিক ছিলেন?
এখন বিশ্বজুড়ে একটাই প্রশ্ন—অপসারিত জেনারেলরা কি সঠিক ছিলেন? যদি তাদের আশঙ্কা সত্য হয়, তবে এই মুহূর্তটি ইতিহাসের পাতায় একটি চরম ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর যদি তারা ভুল হন, তবে একে বলা হবে এক সাহসী সংশোধন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, নিয়ন্ত্রণ আর অনিশ্চয়তার মাঝে দেয়ালটি এখন অত্যন্ত পাতলা।
সারা বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। মার্কিন রণতরীগুলো কি কেবল মহড়া দিচ্ছে, নাকি কোনো মহাপ্রলয়ের সংকেত দিচ্ছে?
ইনকিলাব



























