বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের তালিকায় ইরানি হস্তনির্মিত কার্পেট এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শতাব্দীপ্রাচীন নকশা, সূক্ষ্ম বুননকৌশল এবং প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি রপ্তানি পণ্য নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পরুচির বহিঃপ্রকাশ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ফার্সি বছরের (১৪০৪) প্রথম ১০ মাসে ইরান মোট ২৪ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার হস্তনির্মিত কার্পেট উৎপাদন করেছে। এই খাত থেকে রপ্তানির মাধ্যমে দেশটি ৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে, যা ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের শক্ত অবস্থানেরই প্রমাণ।
তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এ সময়ের মধ্যে উৎপাদিত কার্পেট বিশ্বের ৬১টি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। ইরানের জাতীয় কার্পেট কেন্দ্রের প্রধান জাহরা কামানি জানান, মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৩৭ টন, যার আর্থিক মূল্য ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। এরপর রয়েছে জার্মানি, জাপান, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। এই পাঁচ দেশ ইরানি কার্পেটের প্রধান বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইরানি কার্পেটের ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন পারস্য সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পও বিকশিত হয়েছে এবং যুগে যুগে শৈল্পিক উৎকর্ষতার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কার্পেটের নকশায় ফুটে ওঠে ফুল, লতা-পাতা, জ্যামিতিক অলংকরণ, এমনকি ঐতিহাসিক কাহিনির ছাপও। বিভিন্ন অঞ্চলের কার্পেট তাদের স্বতন্ত্র নকশা ও বুননরীতির জন্য আলাদা পরিচিতি লাভ করেছে। একটি কার্পেট তৈরি করতে কখনো কখনো মাসের পর মাস সময় লাগে; প্রতিটি গিঁটে জড়িয়ে থাকে কারিগরের ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও নান্দনিকতা। এ কারণেই “পার্সিয়ান কার্পেট” বিশ্ববাজারে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এই শিল্পকে আরও গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করতে নানা সহায়ক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। তেহরানের স্থায়ী প্রদর্শনী কেন্দ্রে ৩২তম আন্তর্জাতিক হস্তনির্মিত কার্পেট প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে, যা ইরানের শিল্প, খনি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-এর সহায়তায় অনুষ্ঠিত হবে। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী উৎপাদকদের জন্য স্টল ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কম খরচে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের সামনে নিজেদের পণ্য উপস্থাপন করতে পারেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় কারিগরদের উৎসাহিত করা এবং বৈশ্বিক বাজারে ইরানি কার্পেটের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
হাজারো কারিগরের শ্রম, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে ইরানের হস্তনির্মিত কার্পেট শিল্প আজও ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সেতুবন্ধন হয়ে টিকে আছে। উৎপাদন ও রপ্তানির সাম্প্রতিক সাফল্য প্রমাণ করে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মাঝেও ইরানি কার্পেট তার স্বকীয়তা ও গুণমানের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা, বাজার সম্প্রসারণ এবং ধারাবাহিক সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট সবার। তথ্য সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি



























