বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুসলিম বিশ্বে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে মিসর। সে সময় অসাধারণ কণ্ঠ, নিপুণ তিলাওয়াতশৈলী ও আধ্যাত্মিক আবেদনের মাধ্যমে একদল প্রখ্যাত কারি মিসরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেন। তাঁদের তিলাওয়াত আরব বিশ্ব ছাড়িয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার মুসলিম সমাজেও গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
কীভাবে গড়ে উঠেছিল তিলাওয়াতের এই অনন্য ঐতিহ্য? কেনই বা সেই সোনালি সময়ের পুনরাবৃত্তি আর দেখা যায়নি?
সমসাময়িক গণমাধ্যমের যুগে কোরআন তিলাওয়াতের ঐতিহ্যবাহী ধারাগুলো ধীরে ধীরে বিস্মৃতির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কারিদের সঙ্গে পূর্বসূরিদের তিলাওয়াত-ঐতিহ্যের সংযোগও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাঁদের মতে, বর্তমানে কিছু বাণিজ্যিক ও উপরিতলনির্ভর তিলাওয়াতের প্রবণতা প্রকৃত শৈল্পিক ও চিন্তাশীল তিলাওয়াতকে আড়াল করছে। অথচ মিসরের প্রখ্যাত কারিদের দীর্ঘদিনের চর্চা ও অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা ওয়াকফ (থামার স্থান নির্ধারণ), ইবতিদা (পুনরায় পাঠ শুরু করা), সুরের ব্যবহার এবং তাজবিদের সূক্ষ্ম কৌশল যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে কোরআনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আইকিউএনএ (IQNA) এক ধারাবাহিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিসরের প্রাচীন তিলাওয়াতধারা থেকে শুরু করে কিংবদন্তি কারিদের উত্থানের ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ঐতিহ্যবাহী মিসরীয় তিলাওয়াতশৈলীর সঙ্গে সমকালীন শ্রোতাদের শৈল্পিক চাহিদার সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষ্যও রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোরআন তিলাওয়াতকে নিছক অনুকরণনির্ভর আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি থেকে বের করে একটি জীবন্ত ও গতিশীল শিল্পধারায় পরিণত করা।
ইয়েমেনের সংবাদপত্র আল-ইস্তিকলাল এ বিষয়ে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মিসরীয় কারিদের ‘অতীতের কারি’ কিংবা ‘সোনালি দিনের কারি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। নিবন্ধে বলা হয়, ১৯৪০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত মিসরে কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে একের পর এক অসাধারণ প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের কণ্ঠ ও তিলাওয়াত কেবল মিসরেই নয়, সমগ্র আরব ও মুসলিম বিশ্বে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
শেখ মুহাম্মদ রিফআত ও শেখ মুস্তফা ইসমাইলের মতো ব্যক্তিত্বদের হাত ধরে এই স্বর্ণযুগের বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে মাহমুদ খলিল আল-হুসারি, মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাবি, আবদুল বাসিত আবদুস সামাদ এবং মুহাম্মদ মাহমুদ আত-তাবলাওয়ির মতো প্রখ্যাত কারিরা এ ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। তাঁদের কণ্ঠে মিসরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। ভারত, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছেও তাঁদের তিলাওয়াত ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সুর, অর্থ ও গঠনের অপূর্ব সমন্বয়
প্রখ্যাত কারিদের তিলাওয়াতের স্বাতন্ত্র্য ছিল কণ্ঠের সৌন্দর্যের পাশাপাশি আয়াতের অর্থ ও ভাবের সঙ্গে সুরের গভীর সামঞ্জস্য। আল-মিনশাবির কণ্ঠে শ্রোতারা খুঁজে পেতেন বেদনা ও বিষাদের আবেশ, আবদুল বাসিতের কণ্ঠে ছিল ব্যাপক স্বরবিস্তার ও অনুরণন, আর আল-হুসারির তিলাওয়াতে ফুটে উঠত গাম্ভীর্য ও মর্যাদার আবহ।
তাঁদের কণ্ঠ অনুকরণের চেষ্টা করেছেন অনেকে। কিন্তু সেই স্বাতন্ত্র্য, আবেগ ও শৈল্পিক উচ্চতা পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সময়ের ব্যবধানে তাঁদের অনেকেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁদের তিলাওয়াত আজও কোটি মানুষের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।
এ ক্ষেত্রে রেডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কায়রোর কোরআন রেডিওর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ মিসরের প্রখ্যাত কারিদের তিলাওয়াত শোনার সুযোগ পান। অনেকের কাছে মিসরকে জানার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এই তিলাওয়াত। রেডিওর সম্প্রচার তাঁদের কণ্ঠকে ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়।
মাকামাতের সঙ্গে আয়াতের অর্থের সম্পর্ক
মিসরীয় তিলাওয়াতের অনন্য বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাকামাত বা সুরের বিশেষ ধরনগুলোর প্রসঙ্গও সামনে আসে। প্রচলিত একটি বর্ণনা অনুযায়ী, একবার শেখ মুহাম্মদ সিদ্দিক আল-মিনশাবিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি সব ধরনের মাকামে দক্ষতা অর্জন করেছেন কি না এবং কারও কাছ থেকে তা শিখেছেন কি না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, মাকামাত বলতে কী বোঝায়, তা তিনি জানেন না এবং এ বিষয়ে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনাও করেননি।
এই বক্তব্যের মধ্যেই মিসরের পুরোনো প্রজন্মের কারিদের তিলাওয়াতশৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিহিত রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, আল-মিনশাবি ও তাঁর সমসাময়িক কারিদের তিলাওয়াতে সুরের যে স্বাভাবিক সামঞ্জস্য দেখা যায়, তা আয়াতের অর্থ ও আবেগের সঙ্গে সুরের সহজাত সমন্বয়ের ফল।
তিলাওয়াতের আলোচনায় সাধারণত সাতটি প্রধান মাকামের কথা বলা হয়—সাবা, নাহাওয়ান্দ, আজম, বায়াতি, সিকা, হিজাজ ও রাসত। এগুলোর বিভিন্ন উপধারাও রয়েছে। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রতিটি মাকাম শ্রোতার মনে আলাদা আবেগ তৈরি করতে পারে। যেমন, সাবা মাকামে বিষাদময় আবহ ফুটে ওঠে; সিকা মাকামকে অনেক সময় প্রাণবন্ত অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়; আর বায়াতি মাকামে বিষণ্নতা ও আবেগের প্রকাশ ঘটতে পারে।
তবে এসব মাকামের ব্যবহার কোনো নির্দিষ্ট আয়াতের জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। বরং তিলাওয়াতে সুরের প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাজবিদ, আয়াতের অর্থ, ভাষার সৌন্দর্য ও ভাবের যথাযথ প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের মিসরীয় কারিরা দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও স্বাভাবিক দক্ষতার মাধ্যমে এসব সুরের ধরন আয়ত্ত করেছিলেন। তাঁদের সময়ে কোরআন তিলাওয়াতকারীদের জন্য মাকামাত বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ খুব একটা প্রচলিত ছিল না। এ ধরনের শিক্ষা মূলত সংগীতশিল্পী ও সুরকারদের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ ছিল। তা সত্ত্বেও মিসরীয় কারিরা স্বতন্ত্র তিলাওয়াতশৈলী গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
কেন মিসরেই ঘটেছিল এই সাংস্কৃতিক উত্থান?
মিসরের তিলাওয়াতের স্বর্ণযুগ নিয়ে আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে—কেন সেই সময়ের কারিদের মতো প্রতিভার সমাবেশ আর দেখা যায়নি? কেন একটি নির্দিষ্ট সময়েই এই অসাধারণ বিকাশ ঘটেছিল? আর কেন অন্য অঞ্চলের তুলনায় মিসর এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিল?
আল-ইস্তিকলালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের সংস্কৃতি উপমন্ত্রী আবদুলহাদি আল-আজাজি বলেন, উনিশ শতকে শুরু হওয়া শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংস্কার আন্দোলন মিসরের সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। বিশ শতকে এসে সেই পরিবর্তন আরও বিস্তৃত হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিসরে মিত্রশক্তির গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতিও দেশটির সাংস্কৃতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, সংস্কারক মুহাম্মদ আবদুহর চিন্তাধারা, আরব নবজাগরণ বা নাহদার প্রভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক, জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী আন্দোলনের বিকাশ মিসরকে আরব বিশ্বের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে।
আল-আজাজির ব্যাখ্যায়, এ সাংস্কৃতিক উত্থান শুধু কোরআন তিলাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আরবি ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ, কবিতা ও সাহিত্যচর্চা, সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারও এ পরিবর্তনের অংশ ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর আরব ও ধর্মীয় পরিচয় পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষাও এ প্রবণতাকে শক্তিশালী করেছিল।
মাকতাব: প্রতিভা বিকাশের প্রাথমিক কেন্দ্র
মিসরের তিলাওয়াতের স্বর্ণযুগ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী কোরআনি শিক্ষাকেন্দ্র বা মাকতাবের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকেরা। শহর ও গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিবিড়ভাবে কোরআন মুখস্থ করতেন এবং তিলাওয়াতের নিয়ম ও কৌশল রপ্ত করতেন।
প্রখ্যাত কারিদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের অনেকেই শৈশবে মাকতাবে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কোরআন মুখস্থ করা, শুদ্ধ উচ্চারণ, তাজবিদ এবং নিয়মিত অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে তিলাওয়াতের মৌলিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেতেন। পরবর্তী জীবনে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই অনেক কারি নিজস্ব শৈলী গড়ে তোলেন।
মাকতাবের প্রভাব কেবল কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মিসরের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী উম্মে কুলসুম ও মুহাম্মদ আবদুল ওয়াহাবের মতো ব্যক্তিত্বও সংগীতজগতে প্রবেশের আগে কোরআন তিলাওয়াতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে সাহিত্য ও চিন্তাজগতের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির শিক্ষাজীবনেও ঐতিহ্যবাহী কোরআনি শিক্ষাকেন্দ্রের প্রভাব ছিল।
লেখক ও গবেষক ইসাম আল-কাইসি আল-ইস্তিকলালকে বলেন, বিশ শতকের শুরুতে কিংবা তারও আগে, বিশেষ করে মুহাম্মদ আলীর শাসনামল ও পরবর্তী সময়ে, মিসরে সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও শিল্পকলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের উত্থান ঘটে। ভূমধ্যসাগরের নিকটবর্তী অবস্থান এবং ইউরোপীয় নবজাগরণের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে মিসর আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তাধারার বিভিন্ন উপাদান গ্রহণের সুযোগ পায়। এর প্রভাব পড়ে সমাজের নানা ক্ষেত্রে।
আল-কাইসির মতে, সেই সময়ের মানুষের জীবনযাত্রা, মানসিক প্রস্তুতি ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশও প্রতিভা বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল। আধুনিক জীবনের মতো অসংখ্য তথ্য, দ্রুতগতির গণমাধ্যম ও নানা ধরনের মনোযোগ-বিভ্রান্তি তখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এতটা ব্যাপক ছিল না। ফলে জ্ঞানচর্চা, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে, মিসরের কোরআন তিলাওয়াতের স্বর্ণযুগ কোনো একক প্রতিভা কিংবা একটি বিশেষ সুরের ফল ছিল না। ঐতিহ্যবাহী কোরআনি শিক্ষা, দীর্ঘদিনের অনুশীলন, সাংস্কৃতিক নবজাগরণ, রেডিওর প্রসার এবং আয়াতের অর্থের সঙ্গে সুরের গভীর সমন্বয়—সবকিছু মিলেই এই অনন্য ধারার বিকাশ ঘটেছিল। সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে কেবল কিংবদন্তি কারিদের কণ্ঠ অনুকরণ করাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের তিলাওয়াতের অন্তর্নিহিত জ্ঞান, শৈল্পিক উপলব্ধি ও শিক্ষাপদ্ধতিও সংরক্ষণ করা জরুরি।



























