ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে পদকজয়ী এবং মেধাবী ইরানিদের উদ্দেশে এক বার্তায় বলেছেন, দেশের বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে কিশোর ও তরুণ মেধাবীদের অনন্য ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেছেন, তাঁরা দেশে আশা, অগ্রগতি ও প্রাণচাঞ্চল্যের প্রতীক। তিনি ‘ইরানকে আরও শক্তিশালী’ করার চাবিকাঠি হিসেবে মেধাবীদের বৈজ্ঞানিক সীমা অতিক্রম করে নতুন সাফল্য অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জ্ঞানই ক্ষমতা’—এই সর্বোচ্চ কৌশলগত নীতির আলোকে দেশের অগ্রগতির জন্য গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণ প্রয়োজন।
পার্সটুডে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের তথ্য-প্রচারের ওয়েবসাইটের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ‘দেশপ্রেমিক পদকজয়ী’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সোমবার রাতে বৈজ্ঞানিক ও ক্রীড়াক্ষেত্রে পদকজয়ীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হাজ আলী আকবারি ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার বার্তাটি পাঠ করেন। বার্তাটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হল:
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, এই দিনগুলো জান্নাতের নারীদের শ্রেষ্ঠ নেত্রী, পবিত্র ও নিষ্কলুষ মহীয়সী মহামানবী হযরত ফাতিমা যাহরা (সালামুল্লাহি আলাইহা)-এর শাহাদাতের দিনগুলোর সঙ্গে মিলে গেছে। তাঁর শাহাদাতের সঠিক সময় অজানা থাকা সত্যিই বিস্ময়কর। একইভাবে, এই ঐশী আলোকবর্তিকার পবিত্র সমাধিস্থলের স্থানও গোপন রয়েছে। আর তাঁর উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের প্রকৃত তাৎপর্য মানুষের উপলব্ধির ঊর্ধ্বে।
তিনি ছিলেন ইবাদত, আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে এক অনন্য আদর্শ। মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে বিশেষ ও সর্বাত্মক সহযোগিতা, আমিরুল মুমিনিন হজরত আলী (আ.)-এর বেলায়াতের পক্ষে সাহসী প্রতিরক্ষা, জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা প্রদান, সময়ের দাবি উপলব্ধি করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ এবং সত্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ আদর্শ।
ধৈর্য, আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ সেবা, বিনিময় প্রত্যাশা না করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। স্ত্রী ও মা হিসেবে, সন্তানদের প্রতিপালন এবং মানবজাতির পথপ্রদর্শক পবিত্র ইমামদের বংশধরদের লালন-পালনের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন আদর্শ। প্রচেষ্টা, পরিশ্রম, সংগ্রাম, পবিত্রতা, শালীনতা, তাকওয়া, আলোকময়তা ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অনুসরণীয়। এক কথায়, তিনি ছিলেন সব ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য আদর্শ।
হযরত ফাতিমা (সা.)-এর আদর্শভিত্তিক সমাজের উজ্জ্বল গুণাবলির মধ্যে একটি হলো—এটি ইরানের বিপ্লবী ও মুসলিম জনগণের সামনে বৃহৎ সামাজিক আন্দোলন, সংগ্রাম ও জিহাদের ময়দানে উপস্থিতি, গণআন্দোলন এবং এমনকি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও বিনয়ী, নিঃস্বার্থ সেবার পথনির্দেশ উন্মোচন করে।
আমাদের প্রিয় ইরান এই সময়ে আশা ও সংকল্পের এক বিশেষ প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই আশা, অগ্রগতি এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইরানি মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণদের ভূমিকা অনন্য।
তবে মেধার ক্ষেত্র শুধু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, খেলাধুলা কিংবা বিভিন্ন দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যেকোনো ইতিবাচক ও কাঙ্ক্ষিত ক্ষেত্রে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন মেধার পরিচয় হতে পারে।
আজকাল আমরা এই ভূখণ্ডের এমন কিছু শ্রেষ্ঠ মানুষের মেধার প্রকাশ প্রত্যক্ষ করছি, যাঁরা বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজেদের পবিত্র মাতৃভূমির পতাকাকে সমুন্নত করার জন্য সংগ্রাম করছেন। তাঁরা দূরদৃষ্টি ও জিহাদের ক্ষেত্রে মেধাবী।
আমরা ‘রিজআলি খাজাভি’ ও ‘আলি লান্দি’র মতো ব্যক্তিদেরও মেধাবী হিসেবে বিবেচনা করি, যাঁদের নাম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশদ্বারে লেখা থাকা উচিত। এ ধরনের সমাজের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন শহীদ ও আত্মত্যাগীরা, যাঁরা নিজেদের জীবন ও সুস্থতা উৎসর্গ করে ইসলামী ইরান এবং এর প্রিয় জনগণের ভাগ্যে অসাধারণ প্রভাব রেখেছেন। তাঁরা একমাত্র উপাস্যের কাছ থেকে আল্লাহর দাসত্বের পদক লাভ করেছেন।
প্রথমেই আমি এই সুযোগে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান, গণিত, ভূবিজ্ঞান, ভূগোল, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানবিক বিদ্যার অলিম্পিয়াডে একাধিক পদক ও বৈজ্ঞানিক সম্মাননা অর্জনের জন্য আমাদের দেশের সকল প্রিয় মানুষ এবং প্রত্যেক কৃতী ব্যক্তিকে অভিনন্দন জানাই। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের জন্যও তাঁদের অভিনন্দন জানাই।
একই সঙ্গে কিশোর ও তরুণ মেধাবী থেকে শুরু করে প্রশিক্ষক, শিক্ষক এবং জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিসহ সমাজের সব শ্রেণির মেধাবী মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁরা সম্মান, আশা ও অগ্রগতির কাফেলার অগ্রসেনানী এবং দেশের উন্নয়নের পতাকাবাহী।
দেশের পরিবর্তন সাধনে মেধাবীদের প্রেরণা ও আশা এমন এক উজ্জ্বল শিখা, যা আমি গত বহু বছর ও দশক ধরে প্রত্যক্ষ করে আসছি। দেশের মেধাবী মানুষ ও বৈজ্ঞানিক অঙ্গনের বিশাল, আশাব্যঞ্জক অগ্রযাত্রা এবং বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে বারবার, ধারাবাহিকভাবে এবং প্রতিবছর অর্জিত সাফল্য সমগ্র ইরানি জাতির জন্য গর্ব ও সম্মানের বিষয়।
সাম্প্রতিক দিন ও মাসগুলোতে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রে আমাদের দেশের পরিশ্রমী খেলোয়াড়দের অসাধারণ অবস্থান এবং নতুন রেকর্ড প্রতিষ্ঠা তাঁদের প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, সংকল্প ও ঈমানের পরিচয় বহন করে।
যেসব খেলোয়াড় নিজেদের শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, নৈতিকতা, ঈমান ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্বের সব জাতির সামনে প্রিয় ইরানের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছেন এবং সাহসী ইরানি জাতির প্রাণশক্তি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছেন; যেসব নারী খেলোয়াড় বিশ্বমঞ্চে ইরানি নারীর গর্বের প্রতীক পোশাককে উজ্জ্বল করে তুলছেন; এবং যেসব পদকজয়ী খেলোয়াড় ইরানের জনগণের হৃদয়ে আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করছেন এবং ইসলামী ইরানের গৌরবময় পতাকাকে সম্মানিত করছেন—তাঁদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি শক্তিশালী ইরানের অর্থবহ রূপ নির্মাণে অংশ নিচ্ছেন এবং কার্যকর ভূমিকা রাখছেন।
এই দিনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয়গুলোতে উদ্দীপনা এবং বিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতি মনোযোগের সময়। তাই জ্ঞানানুরাগী, জাতির মেধাবী এবং আমাদের প্রিয় ইরানের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের উদ্দেশে এ বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বলা সমীচীন মনে করছি।
মেধা একটি ঐশী অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ। এর মূল ভিত্তি হলো প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তা। ইরানের জনগণ, বিশেষত আমাদের দেশের তরুণেরা, আল্লাহপ্রদত্ত এই বিপুল সম্পদের অধিকারী।
বিবেক ও আল্লাহর দাসত্বের দাবি হলো, মানুষ যেন যথাযথভাবে আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। হৃদয়, মুখের কথা ও কাজ—কৃতজ্ঞতার সব পর্যায় যথাযথভাবে সম্পন্ন হলে সেই অনুগ্রহের পূর্ণতা অর্জনের পথ উন্মুক্ত হয়।
মেধার এই অনুগ্রহের মূল্যায়ন প্রথমে মেধাবী ব্যক্তিকেই করতে হবে। এরপর তাঁর চারপাশের মানুষ—বাবা-মা, পরিবার, শিক্ষক, অধ্যাপক, বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থাকেও এই মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। এর ফলে এই সক্ষমতার বিকাশ ঘটবে, বৃদ্ধি পাবে এবং সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এই ভিত্তিতে, মেধার নেয়ামত বা অনুগ্রহের প্রতি বাস্তব কাজের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে মেধাবী ব্যক্তির দায়িত্ব আরও বেশি। নিজের মেধাকে বিকশিত ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের ও সমাজের সমস্যার সমাধানে এই প্রতিভাকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো তাঁর কর্তব্য।
মেধাবী ব্যক্তি এমন কেউ নন, যিনি কেবল উল্লেখযোগ্য প্রতিভা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হওয়ার কারণে নিজেকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন এবং শুধু ক্ষণস্থায়ী ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভাবেন। বরং মেধাবী সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের প্রতিভার বিকাশ নিয়ে সচেতন থাকেন, নিজেকে সমাজের একজন কার্যকর সদস্য হিসেবে বিবেচনা করেন এবং নিজের ও সমাজের উন্নয়নে একই সঙ্গে তাঁর প্রতিভা ও সক্ষমতা ব্যবহার করেন।
ইরানি মেধাবীরা দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও প্রতিভাকে জনগণ ও দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানের হাতিয়ারে পরিণত করা সম্ভব। মৌলিক কোষ বা স্টেম সেল-গবেষণা, ন্যানোপ্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে উন্নত মহাকাশ ও বিমানপ্রযুক্তি, শিল্প, খনি, চিকিৎসা, কৃষি, পারমাণবিক বিজ্ঞান, জ্বালানি ও অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই তাঁরা জ্ঞান ও মেধাকে ব্যবহারিক কাজে প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন।
এই অগ্রযাত্রার ফলাফল ও প্রকাশ আমরা বাস্তব জীবনে দেখতে পাচ্ছি। যেমন—বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরানে তৈরি টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন; দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোতে জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির সাহায্যে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করা; কৃষিকাজের কার্যকারিতা বাড়াতে উত্তরাঞ্চলের খামার, বাগান ও ধানক্ষেতের ওপর কৃষি ড্রোনের উড্ডয়ন; উন্নত রুইয়ান প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ধ্যত্বে ভোগা দম্পতিদের সন্তান জন্মদানের সুযোগ সৃষ্টি; রেডিওফার্মাসিউটিক্যালসের সাহায্যে জটিল রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা; পর্যবেক্ষণমূলক উপগ্রহের মাধ্যমে ভূমি, পানি ও কৃষিপণ্য পর্যবেক্ষণ; এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধি।
এগুলো এই বিশাল ও কল্যাণকর অগ্রযাত্রার কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্রে এ ধরনের আরও অনেক অর্জন বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
শক্তিশালী ইরান বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বব্যবস্থা ও বৈশ্বিক সমীকরণে ইরানের ভূমিকা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো এই সক্ষমতা।
গতানুগতিক বৈজ্ঞানিক সীমানাগুলো ভেঙ্গে ফেলুন
অতএব, ইরানকে আরও শক্তিশালী করার চাবিকাঠি হলো দেশের বৈজ্ঞানিক সমস্যাগুলোর সমাধানে মেধাবীদের প্রচলিত বা গতানুগতিক সীমানাগুলো অতিক্রম করা এবং নতুন পথ উন্মোচন করা। ইসলামী ইরানের শত্রুরা যে বিজ্ঞানী ও মেধাবীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায়, তা দেশের শক্তি বৃদ্ধিতে তাঁদের কার্যকর ভূমিকারই প্রমাণ।
যে শত্রু দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে-দেয়া যুদ্ধের সময় এবং তারও বহু বছর আগে দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মেধাবীদের তাঁদের বৈজ্ঞানিক কর্মক্ষেত্র কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশে হত্যা করে, সে ইরানের অগ্রগতি ও শক্তি সহ্য করতে পারে না। ইরানের মেধাবীদের দুর্বল করার জন্য তারা হতাশা সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে তাঁদের মন ও আত্মাকে প্রভাবিত করা, নব্য উপনিবেশবাদের প্রভাববলয়ে গ্রাস করা এবং পশ্চিমা লুণ্ঠন ও পুঁজিকেন্দ্রিক ব্যবস্থার যন্ত্রের অংশে পরিণত করার মতো সব ধরনের হাতিয়ার ও পদ্ধতি ব্যবহার করে।
কিন্তু তারা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না যে, এই জাতির শহীদ মেধাবী, বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্কুলশিক্ষার্থীদের রক্তের প্রতিটি বিন্দু এমন এক সংকল্প ও অগ্রগতির ঝড় সৃষ্টি করেছে এবং করে চলেছে, যা থামানো সম্ভব নয়।
ইরানি জাতি তার প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নানা অর্জন এবং বিশ্বখ্যাত মনীষী ও বিজ্ঞানীদের অবদান স্মরণ করে। একই সঙ্গে তারা কাজার ও পাহলভি শাসনামলের প্রায় দুই শতাব্দীর তীব্র পশ্চাৎপদতা ও ঐতিহাসিক নিষ্ক্রিয়তার কথাও মনে রাখে।
এই জাতি ‘আল-ইলমু সুলতান’—অর্থাৎ ‘জ্ঞানই ক্ষমতা’—এই বিজয়ী সর্বোচ্চ কৌশলগত নীতির মূল্য এবং এর ফলাফল সম্পর্কে সচেতন। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং গত তিন দশকে মেধাবীদের বৈজ্ঞানিক ও গবেষণাগত অগ্রগতি দ্রুততর করা। এই অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য অংশ সম্ভব হয়েছে শহীদ মহান নেতার বিশেষ পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার কারণে—আল্লাহ তাঁর পবিত্র আত্মার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।
বর্তমান সময় এবং তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের আগ পর্যন্ত নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণের আহ্বান মেধাবীদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় পরামর্শ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণ অবশ্যই আরও গভীর ও দ্রুতগতির হতে হবে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈজ্ঞানিক, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় ইরানের প্রত্যেক মেধাবী ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে ইসলামী ইরানের গৌরবময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ, উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য নিজেদের মূল দায়িত্ব পালনে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পাঁচ দফা জরুরি দিক-নির্দেশনা
প্রথমত: দেশে মৌলিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যার বিকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরিকল্পনা থাকতে হবে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতের মতো মৌলিক বিজ্ঞান অন্যান্য বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক প্রযুক্তির প্রধান ভিত্তি। এগুলোর উন্নয়ন দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চালিকাশক্তি। যে জাতিই উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে, তারা মৌলিক বিজ্ঞানের মাধ্যমেই তা অর্জন করেছে। এসব বিজ্ঞানের বিকাশ ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকতে পারে না।
দ্বিতীয়ত: অজানা সত্য আবিষ্কার, মৌলিক বিজ্ঞানের প্রচলিত সীমা অতিক্রম এবং এসব ক্ষেত্রে অমীমাংসিত হিসেবে পরিচিত সমস্যাগুলো—বিশেষত গণিতের সমস্যাগুলো—সমাধানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতাকে একটি লক্ষ্য ও গন্তব্য হিসেবে ধারাবাহিক গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত: বৈজ্ঞানিক জাগরণের মূল চাবিকাঠি হলো সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন। সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক কল্পনাশক্তিকে বিকাশের সুযোগ দেয়া অত্যন্ত জরুরি। এগুলো সব কিংবা অধিকাংশ বিজ্ঞানক্ষেত্রে অগ্রগতি ও নতুন সম্ভাবনার প্রধান উপাদান। নতুন ধারণা উদ্ভাবন, সৃষ্টি ও বাস্তবায়নের জন্য বৈজ্ঞানিক সাহস এবং নতুন ও অনাবিষ্কৃত পথ পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও জাতীয় আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি ও উপকারী।
যাঁরা কার্যকর ও ফলপ্রসূ সৃজনশীলতার পরিচয় দিতে পারবেন, তাঁদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা করাও এই লক্ষ্য অর্জনের পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
চতুর্থত: বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে আত্মনির্ভরতা অর্জন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেশের সীমানার বাইরেও কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।
পঞ্চমত: ব্যবহারিক ও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধাবীদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের প্রথম দিক থেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ স্থাপন এবং জ্ঞানভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠা সহজ করা জ্ঞানকে কাজে লাগানো ও মেধাবীদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাগুলোকে একই লক্ষ্যে পরিচালিত করা এবং মেধাবী ব্যক্তি, বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এমনকি নতুন উদ্যোগগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি জ্ঞান উৎপাদন বা সৃষ্টি থেকে শুরু করে ব্যবহার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি নির্বাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
পানি, মাটি, খাদ্য ও জ্বালানি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যন্ত দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে এই সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের কাজ শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; একইসঙ্গে তা কর্মশালা ও কারখানার সঙ্গেও যুক্ত হবে এবং সেখানে বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তখনই সম্ভব হবে, যখন অর্থনৈতিক সুবিধা ও পণ্য-সেবা বাণিজ্যিকীকরণের বাজার মেধাবীদের প্রেরণা ও সংকল্পের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে জ্ঞান ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্প এবং ভোক্তাবাজারের একটি স্থায়ী ও ধারাবাহিক সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক বিভিন্ন শাখার মেধাবীদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে সরাসরি ও কার্যকর অংশগ্রহণ দেশের অগ্রগতিতে ব্যাপক সহায়তা করবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মেধাবীদের ব্যক্তিগত সক্ষমতা, যুক্তিবোধ এবং সম্মিলিত প্রজ্ঞাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানো।
এই পথ সঠিকভাবে অনুসরণ করা হলে, বিশেষ করে মৌলিক বিজ্ঞানের কিছু শাখায় জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে ইরানে স্থানান্তরিত হবে। অদূর ভবিষ্যতেই ইরান বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের কেন্দ্রে পরিণত হবে।
এর ফলে আমাদের প্রজ্ঞাবান শহীদ নেতার পূর্বোক্ত লক্ষ্যও বাস্তবায়িত হবে—ফারসি ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক ভাষায় পরিণত করা। আল্লাহ তাঁর মর্যাদা আরও উন্নত করুন।
ইনশাআল্লাহ, মেধা ও জ্ঞানের ক্ষেত্রে শহীদদের রক্তের বরকত এবং আমাদের নেতা ও অভিভাবক ইমাম মাহদির (আল্লাহ তাঁর আবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) কল্যাণময় দোয়ার মাধ্যমে জাতির মেধাবী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের গভীর ও দ্রুতগতির বৈজ্ঞানিক জাগরণ এবং যথাসম্ভব আরও শক্তিশালী ইরানের সর্বাঙ্গীণ অগ্রগতি বাস্তবায়ন হবে। এর মাধ্যমে নতুন ইসলামী-ইরানি সভ্যতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনও সম্ভব হবে।
সাইয়্যেদ মুজতবা হোসেইনি খামেনেয়ী
৪ আবান ১৪০৫ হিজরি সৌরবর্ষ
(২৬ অক্টোবর,২০২৬ ইসায়ি সন) #



























