ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতির হামলা সৌদি আরবকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সৌদি নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি যুবরাজের ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তিনি নিজেও প্রাণ বাঁচাতে ছুটে বেড়াচ্ছেন। অন্য রাজপুত্রদের সঙ্গে তাঁর ক্ষমতার দ্বন্দ্বও আলোচনায় আসছে। এ নিয়ে এশিয়া টাইমসে বিশ্লেষণ করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গবেষক জাকির হোসেন। লেখাটি প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন রাফসান গালিব
চতুর্দশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিখ্যাত ‘আল-মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘সক্ষম উত্তরসূরি তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় তৃতীয় প্রজন্মের পর অনেক শক্তিশালী রাজবংশের পতন ঘটে।’
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। যে রাজবংশকে আরও শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার কথা ছিল, তিনি কি উল্টো সেই রাজবংশকেই দুর্বল করে ফেলেছেন?
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—দুই দিক থেকেই সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ছে। সৌদি যুবরাজ যেসব নীতি ও কৌশলের ওপর ভরসা করেছিলেন, সেগুলো একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি ভেবেছিলেন, ইয়েমেনে হুতিদের পরাজিত করে সেখানে নিজেদের অনুগত একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন আনবেন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে থাকবে। এখন দেখা যাচ্ছে, এই তিনটি হিসাবই একসঙ্গে ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
অনেকের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সবচেয়ে ভালো পথ হলো ক্ষমতা হস্তান্তর করা। মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিবর্তে উপযুক্ত কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া, দেশের কূটনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যকর করা।
তা না হলে সৌদি আরব ভেঙে ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা অন্য রাজপুত্রেরা। এ ঘটনায় বর্তমান সৌদি আরবের অস্তিত্বও বিপন্ন হতে পারে।
সৌদি আরবের বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর বাইরের শক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে। দেশটিতে বিপুল জীবাশ্ম জ্বালানির মজুতের পাশাপাশি আনুমানিক ১১ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়ামযুক্ত আকরিক রয়েছে। এসব সম্পদের লোভে থাকা শক্তিগুলো দেশটিকে ভাগ করে নিতে দ্বিধা করবে না।
ইরানে সৌদি আরব নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এখন আরব দেশটি নিজেই পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি যুবরাজের পাশে দাঁড়াতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর অনীহা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।
ক্ষমতায় আসার পর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের জন্য যতটা সুফল বয়ে এনেছেন, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন বলে মনে করেন সমালোচকেরা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেননি। অথচ তাঁর শাসনামলে সৌদি আরবের শত্রুর সংখ্যা বেড়েছে।
সৌদি আরব বছরে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করে। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এই খাতে খরচ হয়। বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩ শতাংশই সৌদি আরবের।
১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হন। আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্যও সৌদি আরবকে অনিরাপদ করে তুলেছে এ ধরনের হামলা।
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদির আর্থসামাজিক রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে কাড়ি কাড়ি অর্থ ও সম্পদ ঢালছেন
২০১৫ সালে মোহাম্মদ বিন সালমান যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ১৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। ওই বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করেন। সেই সংঘাত আট বছর ধরে চলে। সৌদি নেতৃত্বাধীন বোমা হামলা ও অবরোধের কারণে ইয়েমেনে খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দেয়। এ ঘটনায় প্রায় সাত লাখ ইয়েমেনির মৃত্যু হয়।
সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও হুতিদের পরাজিত করতে পারেনি। অথচ হুতিদের সামরিক বাজেট আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ডলারেরও কম। সমালোচকদের মতে, এর কারণ হলো, সৌদি আরবের সামরিক ব্যয়ের বড় অংশ দেশের বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা জোরদার করার পরিবর্তে যুবরাজের শাসন টিকিয়ে রাখা ও তাঁর ক্ষমতা সুসংহত করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সৌদি যুবরাজ প্রায়ই এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে কিংবা ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত আশ্রয়ে চলে যান। ড্রোনের সাহায্যে সম্ভাব্য প্রাণঘাতী হামলা এড়াতেই তিনি এমনটা করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হুতিরা এখনো তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি। তবে রাজপরিবারের ভেতরের শত্রু ও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও সৌদি যুবরাজ বিপুল সম্পদের অপচয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি অর্থনীতিকে বহুমুখী করা। তবে এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্পষ্টতার অভাব রয়েছে। বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইস্তাম্বুলে হত্যা করা হয় সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে। হত্যার পর তাঁর মরদেহ টুকরা টুকরা করা হয়। তিনি সৌদি সরকারের কড়া সমালোচক ছিলেন। তাঁর লেখা ও মন্তব্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হলে দেশটি একসময় এই অঞ্চলের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
এদিকে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সৌদি আরবের তাবুক প্রদেশে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া বিশাল স্মার্ট অঞ্চল প্রকল্প ‘নিওম’ কার্যত দেউলিয়া হওয়ার মুখে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে
রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছেছবি: এক্সের ভিডিও চিত্র থেকে নেওয়া স্থির ছবি
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাঁস হওয়া একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটির আর্থিক দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। নিওমের আওতায় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ সরলরেখার মতো একটি শহর, যার নাম ‘দ্য লাইন’।
তবে ২০৩০ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপো ও ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় প্রকল্পটির পরিসর কমানো হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘দ্য লাইন’ প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ করতে সৌদি আরবের ব্যয় হতে পারে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।
এদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধ সৌদি আরবকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে ফেলেছে। পরে বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অবরোধ এবং হুতিদের পাশাপাশি ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনার কারণে দেশটির তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসও সংকুচিত হয়েছে। প্রথম আলো




























