আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও নৈতিক সংকট মোকাবিলায় কোরআনের মূল্যবোধের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ মুসলিম সাংবাদিক লরেন বুথ। একই সঙ্গে ভোগবাদকে প্রত্যাখ্যান এবং মানুষকে পণ্যে পরিণত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকেই প্রকৃত স্বাধীনতা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ১৩তম আন্তর্জাতিক বেদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ৪ থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ সিম্পোজিয়ামের প্রতিপাদ্য—‘বৈশ্বিক সংকটের কোরআনিক সমাধান’। ইস্তাম্বুল সায়েন্স অ্যান্ড কালচার ফাউন্ডেশন এ আয়োজন করেছে।
বক্তব্যের শুরুতে লরেন বুথ সূরা আল-বাকারার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ওই আয়াতগুলোতে নিজেদের সংস্কারক ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে সমাজে ফাসাদ সৃষ্টি করে—এমন ব্যক্তিদের সমালোচনা করা হয়েছে।
বুথ বলেন, আধুনিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়ও এ ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। তিনি নব্য উদারনীতিবাদী রাজনীতিক, প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও জায়নবাদীদের সংঘাত ও অবিচারে ভূমিকার সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, ‘যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি একই রয়ে গেছে।’ তাঁর মতে, আধুনিক গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের মনোযোগ দখল করে, তাদের আকাঙ্ক্ষা উসকে দেয় এবং ভোগের দিকে ঠেলে দেয়।
ক্ষমতা ও প্রচারণার কৌশল
হজরত মূসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনাকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা করে বুথ বলেন, প্রাচীনকালে ক্ষমতা ধরে রাখতে ভয় ও আকর্ষণের যে কৌশল ব্যবহার করা হতো, আধুনিক যুগে তা আরও পরিশীলিত রূপ পেয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ফেরাউনের উপদেষ্টারা জনসম্মুখে প্রদর্শনীর আয়োজন করে হজরত মূসা (আ.)-কে হেয় করার চেষ্টা করেছিলেন। পরে জাদুকররা সত্য গ্রহণ করলে ফেরাউন তাদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করে শাস্তির হুমকি দেয়।
বুথের মতে, এ ঘটনা দেখায়—ক্ষমতাবানরা কীভাবে প্রচারণা, ভয়ভীতি ও চমকপ্রদ আয়োজনের মাধ্যমে মানুষকে সত্য থেকে দূরে রাখতে পারে।
ভোগবাদ থেকে মুক্তির আহ্বান
ব্রিটিশ এ সাংবাদিক বিজ্ঞাপন ও ভোগবাদী সংস্কৃতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, প্রতিনিয়ত প্ররোচনামূলক বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হওয়ার ফলে মানুষ এমন পণ্য ও জীবনযাপনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যার প্রয়োজন হয়তো আগে তাদের ছিল না।
তিনি নিউরো-লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন প্ররোচনামূলক কৌশলের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিজ্ঞাপনদাতারা সুখ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য আবেগের সঙ্গে পণ্য বা রাজনৈতিক বার্তাকে যুক্ত করে মানুষের ধারণা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেন।
বুথ বলেন, ডিজিটাল কনটেন্টের অবিরাম প্রবাহ এমন এক ‘শব্দদূষণ’ তৈরি করেছে, যার মধ্যে মানুষ কোরআনের ভারসাম্য, তৃপ্তি ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা উপলব্ধি করতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও সচেতনতা), শুকর (কৃতজ্ঞতা), ইহসান (উত্তম আচরণ) এবং জিকির (আল্লাহর স্মরণ)-কে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে তুলে ধরেন।
তাঁর ভাষায়, তাকওয়া মানুষকে কোনো আকাঙ্ক্ষার তাড়নায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে থেমে চিন্তা করতে শেখায়। আর কৃতজ্ঞতা মানুষকে এ ধারণা থেকে দূরে রাখে যে, বেশি বেশি সম্পদ অর্জনের মধ্যেই সুখ নিহিত।
এ প্রসঙ্গে গাজায় থাকা এক বন্ধুর সঙ্গে সাম্প্রতিক ফোনালাপের কথা উল্লেখ করেন বুথ। তিনি বলেন, বন্ধুটি কঠিন পরিস্থিতিতে থেকেও তাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি ভালো অবস্থায় না থাকলেও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। বুথ এটিকে সংকটের মধ্যেও ঈমান ও ধৈর্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
‘প্রকৃত স্বাধীনতা হলো বিক্রি হতে অস্বীকৃতি’
মানুষের মনোযোগ ও দৃষ্টিকে আমানত হিসেবে রক্ষা করার আহ্বান জানান বুথ। তাঁর মতে, শক্তিশালী প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যেন মানুষের মনোযোগ ও দৃষ্টিকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, আল্লাহর জিকির এমন এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের কৌশলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আধুনিক প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সমাধান শুধু আরও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করা নয় উল্লেখ করে বুথ বলেন, মানুষকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে—এমন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এটাই প্রকৃত স্বাধীনতা—বিক্রি হয়ে যেতে অক্ষম থাকা।’
এর মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ও নৈতিক স্বাধীনতা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ন্যায়বিচার হতে হবে নিঃশর্ত
মূলধারার গণমাধ্যমে রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে নিজের ২০ বছরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বুথ বলেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের নামে অনেক সময় পরনিন্দা ও গসিপকে উৎসাহিত করা হয়।
তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে সৎ সঙ্গীকে আতর বিক্রেতার সঙ্গে এবং অসৎ সঙ্গীকে কামারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে সুগন্ধ পাওয়া যায়, আর কামারের আগুনের ধোঁয়া পোশাকে দাগ ফেলতে পারে।
বুথ বলেন, এ শিক্ষা মানুষের চরিত্র ও আচরণে পরিবেশ ও সঙ্গের প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার কখনো স্বার্থের কাছে নত হওয়া উচিত নয়। কোরআনের এমন নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজের, বাবা-মা কিংবা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও হলেও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।
বুথ বলেন, ‘স্বার্থের দিকে ঝুঁকে পড়া ন্যায়বিচার কখনোই প্রকৃত ন্যায়বিচার নয়।’
তিনি বেদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির শিক্ষার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, নুরসি তাঁর সময়ের নৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কোরআনকে হেদায়াত ও আরোগ্যের উৎস হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
বুথ সতর্ক করে বলেন, সাময়িক পার্থিব লাভের জন্য যারা চিরন্তন মূল্যবোধ বিসর্জন দেয়, সেই সভ্যতা শেষ পর্যন্ত নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলে।
ইসলামের দিকে নিজের যাত্রার কথা তুলে ধরলেন
বক্তব্যে নিজের ইসলাম গ্রহণের যাত্রার কথাও তুলে ধরেন লরেন বুথ। তিনি জানান, ইসলাম গ্রহণের কথা যখন তিনি তাঁর দুই কন্যাকে জানিয়েছিলেন, তখন তারা তাকে প্রশ্ন করেছিল—তিনি কি তাদের মা হিসেবেই থাকবেন, মদ্যপান ছেড়ে দেবেন এবং শালীন পোশাক পরবেন?
বুথ বলেন, মেয়েদের এসব প্রশ্ন তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি এগুলোকে মানুষের স্বাভাবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি—‘ফিতরাহ’র শক্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখেন।
জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চান, তা মেয়েদের বোঝানোর পর তারা ইসলামের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে বলেও জানান তিনি।
মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বুথ বলেন, আধুনিক বিশ্বের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকট মোকাবিলায় ক্ষতিকর বলে বিবেচিত সংস্কৃতির অনুকরণ না করে দাওয়াহ—অর্থাৎ সৎ আচরণ, দিকনির্দেশনা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান জানাতে হবে।
তিনি মুসলমানদের ইসলামের শিক্ষার আলো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং অস্থিরতা ও অবিচারে পরিপূর্ণ বিশ্বে নিজেদের মূল্যবোধ দৃঢ়ভাবে ধারণ করার সাহস দেখাতে বলেন।
বক্তব্যের শেষে তিনি প্রজ্ঞা, সাহস ও রহমতের জন্য দোয়া করেন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ফিলিস্তিনের মুক্তির আহ্বান জানান। ইকনা




























