মার্কিন সংবাদপত্র দ্য নিউইয়র্ক টাইমস যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট আরও তীব্র হওয়ার খবর দিয়েছে। জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় লাখ লাখ পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জনসেবার বিল পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের প্রভাব তেলের বাজার ছাড়িয়ে এখন মার্কিনিদের ঘরেও পৌঁছে গেছে। পেট্রলের দাম বৃদ্ধি ছাড়াও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে এবং নিন্ম আয়ের পরিবারগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে আরও বেশি চাপের মুখে পড়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি একটি মৌলিক বৈপরীত্য তুলে ধরেছে। যে সরকার জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেই সরকার এখন এমন এক যুদ্ধের মুখোমুখি, যার ব্যয়ভার শেষ পর্যন্ত নিজেদের নাগরিকদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের খরচও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই চাপ এসে পড়ে বিদ্যুতের বিলে, গাড়ির জ্বালানি খরচে, বিমানের টিকিটের দামে এবং পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার ওপর। এভাবে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্য ও অলীক প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হওয়া সামরিক আগ্রাসন, ইরানের জনগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার মুখে, মার্কিন পরিবারগুলোর দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যানও এই চিত্রের সত্যতা তুলে ধরে। রয়টার্স ১৪ অক্টোবর জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। একই মাসে পেট্রলের দাম বেড়েছে ৯.১ শতাংশ, যা মাসিক ভোক্তা মূল্যসূচকের মোট বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি ব্যাখ্যা করে। একই সময়ে, আগের বছরের তুলনায় গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ০.৭ শতাংশ কমেছে। এই পরিসংখ্যানের অর্থ স্পষ্ট: মার্কিনিরা পণ্য ও পরিষেবা কেনার জন্য আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছেন, অথচ তাঁদের প্রকৃত আয়ের ক্রয়ক্ষমতা এই ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনেও এই চাপের আরও বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডি হিসাব করেছেন, যুদ্ধের কারণে এখন পর্যন্ত প্রতিটি মার্কিন পরিবারের ওপর প্রায় ২ হাজার ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১০০ ডলার এসেছে জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় পেট্রলের দাম ৪৫ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির ব্যয়বৃদ্ধি পণ্য পরিবহনের খরচেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা আগামী মাসগুলোতে আরও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংকটের একমাত্র কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য শুল্ক উৎপাদন ও আমদানির ব্যয় বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আঘাত হেনেছে, যেখানে আগে থেকেই নানা দুর্বলতা বিদ্যমান। জ্বালানির দাম যত বাড়বে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা তত কঠিন হবে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ আরও কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে ঋণের সুদ, বাড়ি কেনার খরচ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকেরা একদিকে মূল্যস্ফীতির শিকার হবেন, অন্যদিকে তাঁদের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়বে।
জ্বালানিসংকট আরও একটি কৌশলগত বাস্তবতা সামনে এনেছে। বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস উৎপাদন করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারের আকস্মিক ধাক্কা থেকে সুরক্ষিত নয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপর পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের তেলবাজার মূল্যায়নে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহে বিঘ্নকে মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারের অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই নির্ভরশীলতা দেখিয়ে দেয়, সামরিক শক্তি থাকলেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
এই অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও দৃশ্যমান। ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক জনমত জরিপের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের কর্মক্ষমতার প্রতি জনসমর্থন কমে ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৮ শতাংশ তাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আগামী ৩ নভেম্বরের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পরিচালিত জরিপগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা ৪৭ শতাংশ সমর্থন নিয়ে রিপাবলিকানদের ৩৫ শতাংশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান একাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে না। তবে এগুলো দেখায়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি নিছক অর্থনৈতিক সতর্কবার্তার চেয়েও বেশি কিছু। যখন পরিবারগুলো বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খায় এবং মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতার নিরিখে বিচার করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের ব্যয়কে শুধু সামরিক হিসাব-নিকাশ বা ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে না। এই ব্যয়ের ছাপ পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের ঘরে, ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এবং নির্বাচনী ব্যালটেও।পার্সটুডে




























